বাগেরহাটে বাড়ি ভাংচুর ও লুটের বর্ণনা দেয়ায় গৃহবধূকে জবাই করে হত্যা

বাগেরহাট সংবাদদাতা:

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার কুনিয়া গ্রামে ইতি বেগম (২০) নামে সদ্যবিবাহিত এক গৃহবধূকে জবাই করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে চুরির অপবাদ দিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে দুটি বসতবাড়িতে হামলা, মারপিট, ভাংচুর ও মালামাল লুটপাটের বর্ণনা দেয়ায় তাকে হত্যা করে বেপরোয়া প্রতিপক্ষ।

 

এ ঘটনায় ইতি বেগমের ভাসুর আমিনুর ইসলাম মীরের ১৩ বছর বয়সী ছেলে সাগর ইসলামও নিখোঁজ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই পরিবারের লোকেরা। বুধবার দুপুরে হত্যার খবর শুনে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্বামীর ঘর থেকে তার জবাইকরা লাশ উদ্ধার করেছে। ইতি বেগম কুনিয়া গ্রামের সদর আলী মীরের ছেলে জাহিদুল মীরের স্ত্রী। মাত্র দুই মাস আগে ইতির বিয়ে হয়েছিল।

 

এর আগে চুরির অপবাদ দিয়ে গত সোমবার (৩০ মার্চ) দুপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে সদর আলী মীরের দুটি বসত বাড়ি ভাংচুর, লুটপাট ও বাড়িতে থাকা নারীদের মারধর করে প্রতিপক্ষরা। ৯৯৯-এ ফোন করে বিষয়টি জানালেও প্রতিকার পায়নি পরিবারটি। পুলিশ ঘুরে যাওয়ার পর ওই পরিবারের ওপর ফের হামলা করে প্রতিপক্ষ। এবার তারা সিন্দুক, গরু, ছাগল, হাস-মুরগি, কবুতরসহ সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে যায় বলে ক্ষতিগ্রস্তরা অভিযোগ করেন। এরপর বিভিন্ন জায়গায় ধর্ণা দেয়ার পরে মঙ্গলবার রাতে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে চিতলমারী থানায় মামলা দায়ের করেন সদর আলীর পুত্রবধূ সানজিদা বেগম।

 

সোমবার দুপুরে হামলার সময় মারধরের শিকার সদর আলী মীরের আরেক পুত্রবধূ সানজিদা বেগম বলেন, ইকবাল, সফিক ও ফেরদৌস আলমের নেতৃত্বে আমাদের বাড়িতে লুটপাট ও ভাংচুর করে। স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকাসহ সিন্দুক, আটটি গরু, দশটি ছাগল, শতাধিক কবুতরসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক মালামাল লুট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। এরপর থেকে হামলাকারীরা হুমকি দিয়ে আসছিল। মঙ্গলবার রাতে থানায় মামলা দায়েরের পর আসামিরা আরও ক্ষিপ্ত হয়। তারা পরিকল্পিতভাবে আমার দেবরের স্ত্রীকে হত্যা করেছে। আমার ভাসুরের ছেলে সাগরকে খুঁজে পাচ্ছি না। হামলার পর থেকে আমরা কেউ বাড়িতে ছিলাম না। কিন্তু পুলিশ আমাদের বাড়িতে গিয়ে থাকতে বলেছে। পুলিশের ওপর ভরসা করেই আমার দেবরের স্ত্রী ও ভাসুরের ছেলে আমাদের বাড়িতে ছিল। দুপুরে ইতির লাশ পাওয়া গেলেও সাগরকে খুঁজে পাচ্ছি না।

 

 

 

নিহত ইতি বেগমের ননদ সৈয়দা সুলতানা বেগম জানান, সোমবার দুপুরে আমাদের বাড়িতে হামলা করে হামলা ও ভাংচুর করে ইকবাল, সফিক ও ফেরদৌস আলমের নেতৃত্বে এলাকার ২৫-৩০ যুবক। আমাদের বাড়িতে থাকা ভাইপো ও ভাইয়ের বউয়ের মুখে হামলার ঘটনা শুনে আমরা ৯৯৯ নন্বরে ফোন দেই। ৯৯৯ স্থানীয় থানা পুলিশের সঙ্গে কানেক্ট করিয়ে দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে এলেও রহস্যজনক কারণে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। সোমবার রাতে তারা আবারও তা-ব চালায়। আমাদের বাড়ি থেকে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, কবুতর ও আলু নিয়ে যায়। সোমবার হামলার পরে এবং মঙ্গলবার রাতে মামলা দায়েরের পরেও স্থানীয় থানা পুলিশ নীরব থাকে। মামলার পর পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এই হত্যাকা- হতো না বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এই নারী।

 

চিতলমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মীর শরিফুল হক বলেন, ইতি খানম ও তার ভাসুরের ছেলে সাগর ইসলাম বাড়িতে ছিল। রাতের কোন এক সময় ইতি বেগমকে জবাই করে হত্যা করা হয়। দুপুরে আমরা লাশ উদ্ধার করেছি।

 

দু’দিন আগে হামলার ঘটনায় পুলিশের অসহযোগিতা ও নিষ্ক্রিয়তার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, হামলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ যায়। আমি নিজেও দুইবার যাই। পুলিশ যাওয়ার পরে আর কোন হামলার ঘটনা ঘটেনি। ওই পরিবারের বিরুদ্ধে থানায় বেশকিছু চুরির মামলা রয়েছে। তাই এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে ওই হামলা করে বলে দাবি করেন তিনি।

 

মঙ্গলবার বিকেলে সাংবাদিকদের যা বলেছিলেন ইতি বেগম ॥ দুপুরে হঠাৎ করে ইকবাল, সফিক ও ফেরদৌস আলমের নেতৃত্বে এলাকার ২৫-৩০ জন যুবক আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে। বাড়িতে থাকা সবাইকে এলোপাথাড়ি মারপিট শুরু করে। আমার দুই ভাসুর মিজানুর ইসলাম ও আমিনুর ইসলাম প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যায়। তারা আমাদের ঘরের মধ্যে থাকা সবকিছু ভাংচুর করে। আমরা চিৎকার শুরু করলে আমার জা সানজিদা বেগমের গলায় ছুরি ধরে তার কোল থেকে ১৮ মাসের বাচ্চা নিয়ে যায়। বাচ্চার গলায়ও ছুরি ধরে বলে চিৎকার করলে মেরে ফেলব। প্রায় দুই ঘণ্টা তা-ব চালিয়ে তারা লোহার সিন্দুকে রাখা ১০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকাসহ সব কিছু নিয়ে চলে যায়। এতে আমাদের প্রায় ১৫ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে।