পিকে হালদারের বান্ধবীর স্বীকারোক্তি অনুমোদন ছাড়াই ১১৬ কোটি টাকা লোপাট

সৈকত মনি, এটিভি সংবাদ 

এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক এমডি প্রশান্ত কুমার হালদারের নির্দেশে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানকে বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই ১১৬ কোটি টাকার বেশি ঋণ দেওয়া হয়। মর্টগেজ (বন্ধক) ছাড়া এফএএস ফাইন্যান্স থেকে এন্ডবি ট্রেডিংয়ের নামে ৩১ কোটি ও ওয়াকামা লিমিটেডকে ৮৭ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। এ ছাড়া এক ঋণ গ্রহীতা পিকে হালদারের অপর বান্ধবী নাহিদা রুনাইকে ১৫ কোটি টাকা ঘুস দেন। যা দিয়ে নাহিদা শেয়ার ব্যবসায় করেন।

বৃহস্পতিবার পিকে (প্রশান্ত কুমার) হালদারের বান্ধবী সুভ্রা রানী আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেই সুভ্রা এসব তথ্য উল্লেখ করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ-পরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান আসামিকে আদালতে হাজির করে স্বীকারোক্তি রেকর্ডের আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহিদুল ইসলাম ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামির স্বীকারোক্তি রেকর্ড করেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

সুভ্রা বলেন, পিকে হালদারের নির্দেশে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান লিপরো ইস্টারন্যাশনালকে বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া ১১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৪১ হাজার ৮৯৭ টাকা দেওয়া হয়। পরে তার (পিকের) নির্দেশিত বিভিন্ন কোম্পানি ও ব্যক্তির হিসাবে টাকাগুলো পাঠানো হয়। শেয়ার ব্যবসা করার জন্য পিকে সিন্ডিকেটের সদস্য ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ঋণ গ্রহীতা স্বপন কুমার মিস্ত্রি ১৫ কোটি টাকা নাহিদা রুনাইকে ঘুস দিয়েছিলেন। যে অর্থ দিয়ে নাহিদা রুনাই শেয়ার ব্যবসা করেন।

জবানবন্দিতে সুভ্রা আরও বলেন, নাহিদা রুনাই (পিকে হালদারের অপর বান্ধবী) ২০০৮ সালের ৮ আগস্ট আইআইডিএফসিতে অফিসার হিসাবে চট্রগ্রাম শাখায় যোগদান করেন। তখন আইআইএফডিসির এমডি ছিলেন আসাদুজ্জামান খান এবং ডিএমডি ছিলেন পিকে হালদার। সুভ্রা সেখানে ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চাকরি করেন। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে আমি (সুভ্রা রানী) রিলায়েন্স ফাইন্যান্সে এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসাবে যোগদান করি। তখন আমার সরাসরি রিপোর্টিং বস ছিলেন পিকে হালদার। ২০১১ সালে রিলায়েন্স ফাইন্যান্সে মো. রাশেদুল হক এসভিপি হিসাবে যোগদান করেন। ২০১৫ সালের জুন মাসে রাশেদুল হক ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে যোগদান করেন। সুভ্রা বলেন, পিকে হালদার আমাকে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে রাশেদুল হকের অধীনে চাকরি করতে বলেন। সেখানে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমি বিজনেস হেড হিসাবে চাকরি করি এবং অফিসিয়াল ঋণ ডকুমেন্টে স্বাক্ষর করি। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির পর এইচআর বিভাগের প্রধান হিসাবে যোগ দেই এবং শেয়ার ডিভিশনও দেখভাল করি।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে যোগদানের পরে কক্সবাজারের এক হোটেলে ছয় থেকে সাতবার মিটিং করেন। এ ছাড়া সিদ্দিকুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম ও পিকে হালদারের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্যাংককসহ বিভিন্ন ট্যুরে যান।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের বিভিন্ন অফিসিয়াল কাজে আরও চার থেকে পাঁচবার দেশের বাইরে ট্যুর করেন। ভারতে কেনাকাটার জন্যই ১০ থেকে ১২ বার গিয়েছেন।

সুভ্রা আরও বলেন, পিকে হালদারের নির্দেশেই মূলত বিভিন্ন অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের ভিজিট প্রতিবেদন ছাড়াই এবং অনেক ক্ষেত্রে কোনো মর্টগেজ না নিয়েই ঋণ দেওয়া হতো। সেসব ক্ষেত্রে ব্যাংকিং রীতি-নীতির বাইরে আমিসহ এমডি রাশেদুল হক, আল মামুন সোহাগ, রাফসান রিয়াদ চৌধুরী ঋণ প্রপোজাল তৈরির পর ইন্টারনাল মেমোতে স্বাক্ষর দেই। পরবর্তীতে বোর্ডে ঋণ অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ওই অর্থ না পাঠিয়ে পিকে হালদারের মৌখিক নির্দেশে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে পাঠান।

সুভ্রা রানীর স্বামী সুব্রত দাস ছিলেন পিকে হালদারের বন্ধু। বুয়েটে তারা এক সঙ্গে লেখাপড়া করেছেন। সে সুবাদে বুয়েটের বিভিন্ন প্রোগ্রামে তার স্বামীর সঙ্গে গেলে পিকে হালদারের সঙ্গেও দেখা হয়। স্বামীর বন্ধু হওয়ায় পিকে হালদার প্রায়ই বাসায় আসতেন। এফএএস ফাইন্যান্স থেকে এন্ডবি ট্রেডিংয়ে কোনো প্রকার মর্টগেজ (বন্ধক) ছাড়াই ৩১ কোটি টাকা ও ওয়াকামা লিমিটেডকে ৮৭ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। ওই ঋণের মধ্যে কয়েক কোটি টাকা সুভ্রা তার স্বামীকে দেন। ওই ঋণের বিষয়ে সুব্রত সবই জানতেন। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দুদক অদ্যাবধি ১৫টি মামলা করেছে। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১১০০ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে আটজন আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।