শ্রীলংকা কলাপ্স : আতঙ্ক নয়, সতর্কতা

মো. হাবিবুল্লাহ, সাবেক ব্যাংকার, অর্থনীতি ও রাজনীতি বিশ্লেষক

দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা নজিরবিহীন এক অর্থনৈতিক টালমাটাল অবস্থা পার করছে।

বিদ্যুৎ, জরুরি ওষুধ

খাদ্য ও জ্বালানী তেলের সংকটসহ নানা ইস্যুতে বিক্ষোভ করছে দেশটির জনগণ। বলা হচ্ছে, ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে কখনো এতোটা দুরবস্থায় পড়েনি দেশটি।

কিন্তু এই অবস্থা কেন তৈরি হল? বিদেশি ঋণ ফেরত দিতে অক্ষম! কার্যত দেশকে দেউলিয়া ঘোষণা করল শ্রীলঙ্কা, সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। অর্থনৈতিক সঙ্কটে টালমাটাল শ্রীলঙ্কার ২৬ জন মন্ত্রী একযোগে পদত্যাগ করেছেন। গত রোববার তারা একযোগে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তবে পদ আকড়ে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে। মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। ২৪ এপ্রিল, ২০২২ শ্রীলঙ্কার শিক্ষামন্ত্রী দীনেশ গুণবর্ধন জানান, রোববার গভীররাতে মন্ত্রিসভার সদস্যরা বৈঠকে বসেন। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় সকলে একসাথে পদত্যাগ করবেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম পদত্যাগ করেন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের ভাতিজা ও প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসের ছেলে ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ মন্ত্রী নামাল। এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, এটি জনগণ ও সরকারের জন্য স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিতে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীকে সহায়তা করবে। এদিকে অর্থনৈতিক সংকটের দরুন দেশে মূল্যস্ফীতি আকাশ ছুঁয়েছে। চালের কেজি গিয়ে ঠেকেছে ২২০ টাকায়। এক কেজি গুঁড়োদুধের দাম গিয়ে পৌঁছেছে ১৯০০ টাকায়। দেশে সাধারণ মানুষের প্রাত্যাহিক পরিষেবাগুলোর অনেকগুলোই এখন সরবরাহ করতে পারছে না সরকার। বিদ্যুৎ নেই, খাবার নেই, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। সবমিলিয়ে গোতাবায়া প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছেই। এদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য মন্ত্রী মমতা কেন্দ্রীয় সরকারকে বলছে “শ্রীলঙ্কার চেয়েও আমাদের অবস্থা খারাপ”I

বাংলাদেশের অবস্থা শ্রীলঙ্কার মতো হবে কি হবে না এই কুলক্ষুনে বিতর্কে না যেয়ে বরং আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থান পর্যালোচনায় তো আর কোনো দোষ নেইI বাংলাদেশের সত্যিকার অবস্থা বুঝার জন্যই আমার আজকের এই প্রয়াস যে অল্প কয়েকটি তথ্য ও হিসাব নিকাশ মিলিয়ে নিলেই কোনো বিশেষজ্ঞর অভিমত ছাড়াই আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারবো যে আমরা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। প্রসঙ্গক্রমে একটি কথা বলি যে বাংলাদেশের অবস্থা শ্রীলঙ্কার মতো হবে কি হবে না আমার মতে এই আলোচনার আশি ভাগ জায়গা জুড়ে আছে বর্তমানে (বৈধই হোক আর অবৈধই হোক) ক্ষমসীন সরকার ও তাঁর “আহা বেশ বেশ জারি গানের” ক্ল্যাপিং বয়েজরা। আমরা কেউ কেউ ক্ষীণ কণ্ঠে ভয়ে ভয়ে প্রশ্নটা তুলবার চেষ্টা করেছি মাত্র কিন্তু সেই প্রশ্নটা ঠিকঠাক মতো তুলবার আগেই ক্ষমতাসীন কর্তা ব্যক্তিরা তার দলবল নিয়ে রীতিমতো ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে কথা বলছেন, সংসদে কথা বলেছেন, এখনো বলছেন, তাঁর অন্য মন্ত্রীরাও কথা বলছেন এবং জানবাজ মিডিয়াগুলি তো রীতিমতো জোরে শোরে সেই কথাগুলোই প্রচার করছেন। সরকারে দেয়া তথ্য উদ্ধৃত করে ট্যারা বুঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে যে বাংলাদেশ শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে এবং এখানে শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেইI কায়োমনোব্যাক্যে আমাদের চাওয়াটা সেটাই I

আমরা যারা নিভৃত পল্লীতে বসবাস করেছি তাঁরা দেখেছি যে বিশাল তেঁতুল গাছ কিংবা বাঁশ ঝাড়ের নিচ দিয়ে ঘনঘর অমাবশ্যার রাতে যখন কোনো লোক যাতায়াত করে তখন লোকটি ভয় দূর করার জন্য জোরে জোরে গান গেয়ে জানান দেয় যে সে ভয় পাচ্ছে না।

একজন নন্দিত আধুনিক কবি (উনার নাম মনে আসছে না) তাঁর একটি কবিতার দুটি লাইন আমাকে বেশ স্পর্শ করেছিল “In fact the nonsense are more happy, কারণ তাঁরা আর যাই হোক চোখ বুঁজে সারা রাত জেগে থাকে না I”

আমরাতো কবির সেই নন্সেন্সদের মতো হ্যাপী নয় I কারণ, আমরা আর যাই হোক চোখ বুঁজে সারা রাত জেগে না থেকে পারি না, আর অজানা আশংকায় আঁতকে উঠি; কারণ আমরা ননসেন্স নয় I শ্রীলংকা বিপর্যয়ের পটভূমিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান কিছু সম্ভাব্য ঝুঁকি ও বিপদের আশঙ্কা নিয়ে কিছু অর্থনীতি বিশ্লেষক কথা বলেছেন যার মধ্যে পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইস মনসুর তিনি কয়েকটি পত্রিকায় কলাম লিখে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও বিপদের আশংকার ধারণা দিয়েছেন। একটা দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ কেমন সেটা বুঝবার অন্যতম প্রধান ইন্ডিকেটর হলো সেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলারের রিসার্ভ কি অবস্থায় আছে এবং সেই দেশের এবং সেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলারের উপার্জন বা রেমিট্যান্স ইনফ্লো প্রবাহ টা কোন অবস্থায় আছে সেটা I

সারাবিশ্বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বা বৈশ্বিক লেনদেনে এখনো ডলারের আধিপত্ত মোটামুটি ৮০% এই ডলারের মজুদ যদি না থাকে এবং উপার্জনের চলমান প্রবাহে যদি তেজী ভাব না থাকে তাহলে সেই দেশ ঝুঁকির মধ্যে আছে সেটা ধরে নিতে হবে I বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ব্যবধানে রেকর্ড চলতি হিসাব ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ, আমাদের রফতানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি। চলতি অর্থবছরের (2021-2022) প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি US$18-বিলিয়ন ছাড়িয়েছে, যা দেশের চলতি হিসাবের কোষাগারে একটি ফাঁকা গর্ত সৃষ্টি করছে। উভয় অ্যাকাউন্টেই ঘাটতি বাড়তে থাকে কারণ উচ্চ আমদানি অর্থপ্রদান রপ্তানি আয়কে ছাড়িয়ে যায় এবং রেমিট্যান্সও ধীর হয়ে যায়, অফিসিয়াল ডেটা দেখায়, এইভাবে অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে এবং উচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি সহ রেমিটেন্সের কম প্রবাহ দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতিকে “সর্বকালের সর্বোচ্চ” $ 10.06 বিলিয়নে ঠেলে দিয়েছে পর্যালোচনাধীন সময়ে, কর্মকর্তারা বলছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, বাকি বিশ্বের সাথে বাণিজ্য ব্যবধান 2021-22 অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ের মধ্যে 82 শতাংশ বা $8.43 বিলিয়ন বেড়ে $18.69 বিলিয়ন হয়েছে, যা FY’21 এর একই সময়ের মধ্যে $10.27 বিলিয়ন থেকে। পরিসংখ্যান এই সময়ের মধ্যে, আমদানি ব্যয় 46 শতাংশের বেশি বেড়েছে যেখানে রপ্তানি আয় 29.23 শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাই-জানুয়ারি মেয়াদে সামগ্রিক আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে $46.67 বিলিয়ন যা আগের বছরের একই সময়ে $31.92 বিলিয়ন ছিল যেখানে রপ্তানি আয় $21.65 বিলিয়ন থেকে বেড়ে $27.98 বিলিয়ন হয়েছে। আমরা সবাই জানি যে আমদানি পণ্যের মূল্য, ন্যাশনাল গ্রিডে যে বিদ্যুৎ যোগ হয় তার বেশিরভাগই প্রাইভেট কোম্পানির কাছ থেকে কেনা হয় যার মূল্য ডলারে পরিশোধ করতে হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশে যে সমস্ত মেগা প্রকল্প বিদেশী ঋণের টাকায় পরিচালিত হচ্ছে সেখানে বিদেশী দাতা সংস্থা ও বিদেশী ঠিকাদারদের ডলারে পেমেন্ট করতে হয়। বিদেশী ঋণের কিস্তি ডলারে পরিশোধ করতে হয়। আজকের শ্রীলঙ্কার কাছে এই পর্যাপ্ত ডলারের মজুদ না থাকার কারণেই কিন্তু তারা এই লংকা কান্ডের মধ্যে পড়েছে।

বাংলাদেশের সরকার দাবি করছে যে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ডলারের মজুদ ৪০ থেকে ৪২ বিলিয়ন ডলার যা দিয়ে আমরা বেশ কয়েক মাসের আমদানি মূল্য মিটাতে পারবো। এক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশের একটা ফিন্যান্সিয়াল ডায়াগনোসিস করে দেখি আমাদের অর্থনীতির কোথায় কি অবস্থা। প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন বাংলাদেশ কখনো বিদেশী ঋণ খেলাপি হয়নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ২০২২ সালের আগে শ্রীলঙ্কাও কিন্তু কখনো ঋণ খেলাপি হয়নি। তাদের জিডিপি গ্রোথ, মাথা পিছু আয় সহ উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে শ্রীলংকা শুধু আমাদের চেয়ে এগিয়ে ছিলো তাই নয়, তারা দক্ষিণ এশিয়ার সকল দেশের চেয়ে এগিয়ে ছিলো। একটা সময় একথা বলাবলি হতো যে দক্ষীন এশিয়ার মধ্যে কোনো দেশ যদি উন্নত দেশে পরিণত হয় সেক্ষেত্রে শ্রীলংকা হবে প্রথম।

আজ থেকে তিন চার বছর আগেও শ্রীলংকা ভাবতে পারে নি যে তাদের এই করুন দশা হবে. তাদের জনসংখ্যার বিপরীতে তাদের যে ডলারের রিজার্ভ সেটা আমাদের তুলনায় বেশি ছিলো এবং জিডিপির তুলনায় বিদেশী ঋণ আমাদের তুলনায় অনেক কম ছিল। অন্যদিকে নিয়মিত আমদানির বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার উপার্জন প্রবাহ সেটাও আমাদের তুলনায় বেশি ছিল। তাদের জনসংখ্যা ২ কোটি এর বিপরীতে দুই আড়াই বছর আগে তাদের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৮ বিলিয়ন ডলার সেই হিসাবে আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ যদি ৬৫ বিলিয়ন ডলার হতো তাহলে আমরা শ্রীলংকার রিজার্ভের সম পরিমান যেতে পারতাম। সরকারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী আমাদের সর্বোচ্চ রিজার্ভ ছিলো ৫০ বিলিয়ন ডলার ২০২১ সালের শেষের দিকে। শ্রীলংকার ৮ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ ছিলো ধরা যাক ৩০ মাস আগে। এই গত ৩০ মাসে শ্রীলঙ্কার ৮ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ নামতে নামতে ২ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে সরকারের বিভিন্ন সোর্স থেকে পাওয়া তথ্য মতে আমাদের ৫০ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ সরকারের দাবি অনুসারে গত ৪/৫ মাসে ৪০ বিলিয়ন ডলার দিকে নিম্নগামী যেখানে অন্যান্য বিভিন্ন সুত্র মতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে I অর্থাৎ, প্রতিমাসে গড়ে হ্রাস হচ্ছে ২.৫ বিলিয়ন ডলার I আমাদের রিজার্ভ ৪০ বা ৪২ বিলিয়ন ডলার যাই হোক না কেন প্রতি মাসে গড়ে যদি ২.৫ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি হয় তাহলে সেটা শূন্যের কোঠায় আসতে কত মাস লাগবে ? এখন চলুন বাংলাদেশের বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত রিপোর্টে দিকে কী বলছে তারাI দৈনিক যুগান্তর ১৯ এপ্রিল ‘২০২২ প্রকাশিত রিপোর্টে বলেছে বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে ডলারের সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে।

আমদানি বিলসহ বিভিন্ন খাতে প্রতি মাসে গড়ে ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে. এর বিপরীতে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স সহ প্রতি মাসে আমাদের ডলারের উপার্জন হচ্ছে ৭.৫০ মিলিয়ন ডলার। আমাদের রিজার্ভ যদি ৪২ বিলিয়ন ডলার হয় তাহলেও প্রতি মাসে রিজার্ভ ঘাটতি ২.৫০ বিলিয়ন ডলার। এমতাবস্থায়, আমাদের রিজার্ভ এই ৪২ বিলিয়ন ডলার শেষ হতে কত মাস লাগবে? আমরা আমজনতা গভীর ঘুমে আছি। অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র অন্ধকারে ঢেকে আছে। আসলে আমাদের দুর্ভাগ্য হল বাংলাদেশের অতীত বর্তমান সব সরকারগুলো তাদের সামান্য কীর্তিমান কাজগুলি ঢোকঢাল পিটিয়ে প্রচার করে তৃপ্ত থাকে অথচ, তাদের আবীলতাময় অপকীর্তি এবং সত্য তথ্যগুলি কার্পেটের নিচে চাপা দিয়ে একটা ডিনায়াল স্ট্যান্ড নিয়ে সত্যের হুইসেলব্লোয়ারদের সঙ্গে কুতর্কে জড়িয়ে থাকে।

এখন আসুন দেখি আমাদের সত্যিকারে বিদেশী ঋণের পরিমাণ কত। সরকারের বহি:সম্পদ বিভাগের (ইআরডি) থেকে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক আমাদের বিদেশী ঋণের পরিমাণ ৬০ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে পরিস্কার দেয়া আছে এই মুহূর্তে বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋনের পরিমান ৯১ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া, অভ্যন্তরীণ খাত ব্যাংক ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া সরকারের ঋণের পরিমাণ ১৪ লক্ষ্য কোটি টাকাI এবার বাংলা ট্রিবিউন পত্রিকা যার মালিক সরকারদলীয় সাংসদ কাজী নাবিল আহমেদ।

বিশেষজ্ঞ মহল বলছেন গত সাত বছরে বৈদেশিক ঋণের হার ১০ গুন্ বেড়েছে। ৬ এপ্রিল ২০২২ এই পত্রিকায় জনৈক গোলাম মাওলার একটা লেখায় যে বাস্তবতা ফুটে উঠেছে তা হলো চটজলদি একথা বলা যাবে না যে আমাদের অবস্থা শ্রীলঙ্কার মতো। তবে আন্তর্জাতিক পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কারণে ভেতর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ক্ষত তৈরী হচ্ছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে শুরু করেছে. পি আর আই -এর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইস মনসুর বলেছেন, দেশের রিজার্ভ কমে যাচ্ছে তবে এখন পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার মতো ভয়ের কারণ নেই I পরিস্থিতি আগের চেয়ে দুর্বল হতে শুরু করেছে, সামষ্টিক অর্থনীতিও আগের মতো শক্ত নয় I দেশের চলতি হিসাবে বিশাল ঘাটতি যা শ্রীলংকার ও হয়েছিল I এবার যে ঘাটতি হতে যাচ্ছে তা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ, সুতরাং উদ্বেগের কিছু জায়গা তৈরী হচ্ছে I এ অবস্থায় ডলারের বিনিময় হারে সমন্বয় দরকার ছিলো কিন্তু তা হয় নি I সর্বশেষ হিসাবে আমদানি বেড়েছে ৫৪ শতাংশ যা ডলারের মজুদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে I বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৪ হাজার ৪২৫ কোটি (৪৪ বিলিয়ন) ডলারে নেমে এসেছে যা ছয় মাস আগেও ৫০ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড উচ্চতায় ছিল I এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ২.১৬ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড আমদানি বিল পরিশোধের পর গত ৬ মার্চ রিজার্ভ ৪৩.৮৯ বিলিয়ন ডলার নেমে আসে যা ছিলো এক বছরের মধ্যে সব চেয়ে কম I রফতানি আয়, বিভিন্ন রকম সেবা ভিত্তিক আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির ফলে একমাসে আবার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৪৪ বিলিয়ন ডলার I এখনকার আমদানি খরচের হিসাবে এই রিজার্ভ দিয়ে পাঁচ মাসের কিছু বেশি সময় আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব I অথচ, ৬ মাস আগেও ১০ মাসের আমদানি খরচ মেটানোর রিজার্ভ ছিলো বাংলাদেশ ব্যাংকে I

ডলার সংকট

বেশ কয়েক মাস ধরে দেশের বাজারে মার্কিন ডলারের দাম অস্থিতিশীল. আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ডলারের বিপরীতে টাকার মান দুর্বল হয়ে যাচ্ছে I সর্বশেষ গত ২৩ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমিয়েছে যা প্রতি ডলার ৮৬ থেকে বাড়িয়ে ৮৬.২০ করা হয়েছে I এর আগে জানুয়ারির শুরুতে ডলারের মূল্য ২০ পয়সা বাড়িয়ে ৮৬ করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক I এতেকরে রফতানিকারক ও প্রবাসীরা লাভবান হলেও আমদানি খাতে খরচ বাড়বে অর্থাৎ ডলারের রিজার্ভ কমবে I একজন ব্যাংকার হিসাবে আমি মনে করি ডলার নিয়ে দেশের মুদ্রা বাজার এখন অস্থির I সরবরাহ কম চাহিদা তুঙ্গে I এর প্রভাব পড়ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে I পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি করে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে এতে ব্যাংকগুলোতেও টাকার সংকট তৈরী হচ্ছে I

বাণিজ্য ঘাটতি

বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি ও ডলারের দাম আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষক ও ব্যবসায়ীরা I বর্তমানে বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড পরিমান ১২৫ শতাংশ বেড়েছে, অন্যদিকে আমদানি বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্রমান্বয়ে কমায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে I বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আমদানি হয়েছে ৩ হাজার ৮৯৭ কোটি ডলার যা আগের বছর ছিল ২ হাজার ৫২২ কোটি ৬০ লক্ষ্ ডলার I গত বছর জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৬৮৭ কোটি ৩০ লক্ষ ডলার যা চলতি বছরে ১ হাজার ৫৬১ কোটি ৬০ লক্ষ ডলার সেই হিসাবে চলতি বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত বাণিজ্য ঘাটতি ১২৫ শতাংশ হতে পারে I

ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঘাটতি

কোভিড মহামারীর ধাক্কা সামলে যখন অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে তখনই আমদানির চাপে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ঘাটতিতে পড়েছে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাব ভারসাম্য I বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যাচ্ছে ২০- ২১- ২০২২ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬ কোটি ২০ লক্ষ ডলারে I দেশের ইতিহাসে ব্যালেন্স অব পেমেন্ট এর এতোবড়ো ঘাটতি আর হয় নি I আগের অর্থ বছরে এই সময়ে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত ছিলো ১৫৫ কোটি ৬০ লক্ষ ডলার I বাণিজ্য ঘাটতির এই ধারাবাহিকতায় আমাদের অর্থনীতিও আগেই কলাপ্স হয়ে যাওয়ার কথা ছিল. কিন্তু হয় নি কেন জানেন? আমরা সভ্যতা ও শিক্ষার মুখোশ পরিহিত সভ্য, শিক্ষিত, লুটেরা, চোর, বাটপার, ধান্দাবাজ দুর্নীতিবাজ ও পাচারকারী মানুষ নামের কলংকিত প্রাণীদের কাছে যারা অপাংতেয়, অস্পৃশ্য, অশুচি, উপেক্ষিত, অবহেলিত পরিবার পরিজন ফেলে রেখে বছরের পর বছর ধরে যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশে পাঠায় সেই মহীয়ান, গরীয়ান সম্মানিত প্রবাসী ভিআইপি কর্মজীবীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে আমরা বেঁচে যাচ্ছি আর হবুচন্দ্র রাজার গবুচন্দ্র মন্ত্রীদের ভাড়ামিতে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছি এবং ভারতের বাংলা সিনেমা “মুখ্য মন্ত্রী” স্টাইলে ফুটানি করছি I উনাদেরকে আমরা মানুষ মনে করি না , তাচ্ছিল্যভরে ডাকি আদম বলে I উনাদের সাথে সংশ্লিষ্ট দেশের কূটনৈতিক মিশন ও দেশের বিমান বন্দরে যে হয়রানি করা হয় তা “কত কষ্টে কামাই করে খাওয়ানো হারক্লিষ্ট বাবার সাথে বখে যাওয়া ড্র্যাগ এডিক্টেড সন্তানের দুর্ব্যবহার ছাড়া আর কি বলা যায় ! দেশে যখন চোর, গুন্ডা, বদমাইশ, দুর্নীতিবাজ, দেশের সম্পদ পাচারকারী বিগ গানস লুটেরা শ্রেণীর ভিআইপিদের লম্ফঝম্মফ দেখি তখন বিবেকের অস্ফুট বোবা কান্নায় চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া করিতে পারি না চিৎকার, শুধু গোংড়ায়ে বলি “হে আমাদের অর্থনীতির প্রাণভোমরা প্রবাসী ভাই ও বোনেরা, তোমরাই তো দেশের প্রকৃত ভিআইপি, তোমরাই তো প্রকৃত সিআইপি I

বৈদেশিক ঋণ, নির্ভরতা এবং মেগা প্রকল্প:

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নে বিভিন্ন সরকার মেগা-প্রকল্প গ্রহণ করেছে। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে, এটি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে এবং সত্যটি রয়ে গেছে যে বিগত ৪০ বছরে দেশটির বৈদেশিক ঋণ বিগত ১০ বছরের তুলনায় অনেক বেশি। বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাপানের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে রেয়াতি ঋণ নিয়ে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো এতদিন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ফলস্বরূপ, এই ঋণগুলির সুদের বোঝা কম এবং পরিশোধের দীর্ঘ সময় ছিল। বর্তমানে চীন এবং রাশিয়া তহবিল দ্বারা মেগা প্রকল্পগুলি তুলনামূলকভাবে স্বল্পমেয়াদী তবে উচ্চ ব্যয় প্রায় ৪% সুদে কোনোভাবেই মধপন্থী বা উদার শর্তাবলীর অধীনে নয় I ফলে এ সময়ে  সরকার শীঘ্রই একটি বিশাল ঋণের বোঝা বহন করবে । সরকারকে আগামী ২/৩/৪ বছরের মধ্যেই একটা বিশাল বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে রিপেমেন্ট শুরু করতে হবে এবং ব্যাপক অভ্ভন্তরীন ঋণ মিটাতে হবে তখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ক্রমবর্ধনশীল আমদানি ও বাণিজ্য ঘাটতির দুষ্টচক্করে আটকা পড়তে পারে I

মহামারী চলাকালীন ২০২০ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭০.৭ বিলিয়ন ডলার যা ২০২০ সালের মার্চের তুলনায় প্রায় ১৬% বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ঋণ বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিগত ১১ বছরে, বৈদেশিক ঋণ ১৮০%  বৃদ্ধি পেয়েছে। সাতটি মেগা প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৪ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৮৭ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা, বৈদেশিক সহায়তা থেকে ১ লাখ ৮৫ হাজার ১২৪ কোটি টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার তহবিল থেকে ২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে। সুতরাং, সরকার তার দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের জন্য মূলত বৈদেশিক ঋণের উপর নির্ভরশীল। ঋণ ফাঁদ কূটনীতি হল একটি তত্ত্ব, যা একটি শক্তিশালী ঋণদানকারী দেশ বা প্রতিষ্ঠান দ্বারা ঋণগ্রহীতা দেশকে প্রচুর ঋণ দিয়ে বাধা দেওয়ার বর্ণনা দেয়, যাতে দেশটি সম্পূর্ণভাবে তার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

পাকিস্তানের পরেই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা বিনিয়োগের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রহণকারী। সমালোচকরা শ্রীলংকার অভিজ্ঞতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, তার ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার পরে, শ্রীলঙ্কা ৯৯ বছরের জন্য চীনকে তার দক্ষিণ বন্দর হাম্বানটোটা লীজ দিতে বাধ্য হয়েছে । বাংলাদেশে এর আগেও চরম দুর্নীতি ও যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাবে ঋণের টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। সুতরাং, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা উচিত এবং প্রকল্পগুলি দক্ষতার সাথে পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।

সরকারের উচিত ঋণ না নিয়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। কর আদায়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও আগ্রহী ও দক্ষ হতে হবে। পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। সর্বোপরি, সরকারকে ঋণ নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং বৈদেশিক ঋণ কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

স্ন্যাপশট অন এডিবি ওভারভিউস

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক (এডিবি) অনুসারে, মহামারীর ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি 2019 সালে 8.2% থেকে 2020 সালে 5.2% এ নেমে এসেছে। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরকার তথাকথিত ওয়ান স্টপ সার্ভিস রুলস (ওএসএস) চালু করেছে। বেসরকারী এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলি খেলাপি ঋণের উচ্চ সংখ্যক লুকানোর জন্য খারাপ ঋণগুলি বন্ধ করে এবং নিয়মগুলি পুনরায় লিখতে থাকে। এর মহামারী উদ্দীপনা প্যাকেজের অংশ হিসাবে, সরকার ঋণ পরিশোধের পুনর্নির্ধারণ করেছে।

স্ন্যাপশট অন টিআইবি ওভারভিউস

আমদানি ও রপ্তানির মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ বছরে 8-9 বিলিয়ন ডলার অনুমান করা হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও দুর্নীতিবাজদের অর্থ যোগ করলে মোট পরিমাণ হবে $12-15 বিলিয়ন। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম প্রোগ্রাম কানাডার বেগম পাড়ায় অনেক লোক, বেশিরভাগই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী, প্রচুর অর্থ পাচার করছে। শনিবার ঢাকায় ইকোনমিক্স স্টাডি সেন্টার ও ইএমকে সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘অফশোর ওয়েলথ অফ ডেভেলপিং কান্ট্রিস: ইম্পিডিমেন্ট টুওয়ার্ডস ইনক্লুসিভ গ্রোথ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। শনিবার ঢাকায় ইকোনমিক্স স্টাডি সেন্টার ও ইএমকে সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘অফশোর ওয়েলথ অফ ডেভেলপিং কান্ট্রিস: ইম্পিডিমেন্ট টুওয়ার্ডস ইনক্লুসিভ গ্রোথ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

শেষ কথা কিন্তু শেষ নয়

বাংলাদেশে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন, বৈদেশিক ঋণের ক্রমবৃদ্ধি, সঠিকভাবে মেগা প্রোজেক্টের ফিজিবিলিটি স্টাডি না হওয়া, প্রাক্কলন বাজেটের ৪ গুন্ ৫ গুন বৃদ্ধি পাওয়া, সময়মতো প্রজেক্ট সম্পন্ন না হওয়া, এ ছাড়া আমাদের যে ৯১ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ, গত সাত বছরে বৈদেশিক ঋণের হার ১০ গুন্ বৃদ্ধি এবং এইসব ঋণের টাকায় যে সমস্ত বড় বড় মেগা প্রোজেক্টের কাজ চলছে সে সমস্ত ঋণের কিস্তি এখনো পরিশোধ শুরু হয় নি I বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গ্রেইস পিরিয়ড চলছে I আগামী ২,৩,৪ বছরের মাথায় যখন এই ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে তখনি হবে আসল লংকাকান্ড I অবশ্য আমরা জানি এইসব লঙ্কাকাণ্ডে ক্ষমতায় যারা থাকেন (উল্লেখ্য, শ্রীলংকাতেও মোটামুটি পরিবারতান্রিক সরকার যেমন, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী পরিষদে ভাই, ভাসতে, ভাগ্নে এই আর কি…ওরাই ওরাই ) তাদের তেমন কিছু যাই আসবে না কারণ তাদের লুট করা পাচার করা লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা, বিদেশে একাধিক বাড়ি, গাড়ি, অঢেল সম্পদের পাহাড় তাঁরা করে রেখেছেন, বিপদ আসলেই সুইফট পাখির মতো তাঁরা ফ্লাই করবেন I

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন শ্রীলংকা যে সমস্ত কারণে কোলাপ্সড হয়েছে তার মধ্যে সব চেয়ে বড় কারণ হলো কতিপয় অলাভজনক মেগা প্রজেক্ট I আমাদেরও তো এরকম অনেকগুলো মেগা প্রজেক্ট আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, পদ্মা রেল সেতু প্রকল্প  এবং দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত রেল লাইন নির্মাণে চলমান প্রকল্পে বিশাল অংকের ব্যয় অলাভজনক মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞরা।

সোয়া লক্ষ কোটি টাকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের অপরিহার্যতা নিয়েও গবেষকদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ আছে I সোয়া লক্ষ কোটি টাকার এই প্রজেক্ট থেকে আমরা মাত্র ২০০০ MW বিদ্যুৎ পাব I দেশে এমনিতেই বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত আছে, উৎপাদন ক্ষমতার পুরোটা ব্যবহারও হচ্ছে না I রাশিয়া থেকে অনমনীয় ঋণের ফাঁদে পা দিয়ে বিপুল অংকের ঋণ নিয়ে বাস্তবায়অধীন এই প্রকল্পের জন্য কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের ঋণের দায়ভার মেটাতে কিস্তি পরিশোধের চাপে পড়তে হবে I কথিত আছে, এই একই প্রকল্প ভারত রাশিয়া থেকে যে দামে কিনেছে আমরা তার দ্বিগুন দামে কিনেছি I এই যেমন ৫০০ টাকার বালিশ ৭০০০ টাকা, ১৪ হাজার টাকার পর্দা ১৪ লক্ষ টাকা, ১ কেজি নাটবল্টুর দাম ১ কোটি টাকা ইত্যাদি ইত্যাদি সেইরকম আর কি ! সামনে আসছে পদ্মা রেল সেতু যার ব্যয় মূল পদ্মা সেতু থেকেও না কি অনেক বেশি হবে I লাগামহীনভাবে আমাদের সরকার উন্নয়নের রথযাত্রায় অনেক মেগা প্রকল্প হাতে নিচ্ছেন যা চীনা ঋণের ফাঁদে পা দিয়ে I

বিভিন্ন দেশ এবং দাতা সংস্থা থেকে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত যত ঋণ নিয়েছে তার মধ্যে সব চেয়ে কঠিন শর্তের ঋণ হলো চায়না ও রাশিয়া থেকে নেয়া ঋণ I ক্রমাগত কঠিন শর্তের ঋণে আমরা আটকা পড়েছি. অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের আপাত:দৃষ্টিতে এই ঋণ পরিশোধের দায়ভার অনাগত জেনারেশনের ঘাড়েই পড়বে I যেখানে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি ১২৫ শতাংশ, বিগত ৪০ বছরে দেশটির বৈদেশিক ঋণ বিগত ১০ বছরের তুলনায় অনেক বেশি, বিগত ১ ১ বছরে, বৈদেশিক ঋণ ১৮০% বৃদ্ধি পেয়েছে, বর্তমানে চীন এবং রাশিয়া তহবিল দ্বারা মেগা প্রকল্পগুলি তুলনামূলকভাবে স্বল্পমেয়াদী তবে উচ্চ ব্যয় প্রায় ৪% সুদে নেয়া, দেশের বাজারে মার্কিন ডলারের দাম অস্থিতিশীল, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ডলারের বিপরীতে টাকার মান দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, আমাদের রিজার্ভ এই ৪২ বিলিয়ন ডলার, প্রতি মাসে রিজার্ভ ঘাটতি ২.৫০ বিলিয়ন ডলার, বৈদেশিক ঋনের পরিমান ৯১ বিলিয়ন ডলার, বিপুল অংকের ঋণ নিয়ে বাস্তবায়অধীন প্রকল্পের জন্য কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের ঋণের দায়ভার মেটাতে কিস্তি পরিশোধের চাপে পড়তে হবে I

কোনো দেশের জিডিপি আর ঋণের অনুপাত যদি ৪০ শতাংশ বা এর চেয়ে বেশি হয় তখন অর্থনীতির বিবেচনায় ধরে নেয়া হয় দেশ টি দেউলিয়া হওয়ার পথে I আমাদের জিডিপি আর ঋণের অনুপাত ৩৬ শতাংশ I অর্থাৎ বিপদ সীমার সন্নিকটে I এহেন পরিস্থিতিতেও আমাদের প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং অন্যান্ন মন্ত্রীরা যখন আস্থার (?) সাথে বলেন “আমাদের অর্থনীতি বিশাল শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে এবং এখানে শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থা হওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই” তখন কার ঘাড়ে দুটো মাথা আছে দ্বিমত করবে ? যাহোক, আমরা আদার ব্যাপারী এত বড় বড় জাহাজের খবর নিতে গেলে ডুবে যেতে পারি I সুতরাং এ নিয়ে আমরা অহেতুক উদ্বিগ্ন না হয়ে চলেন নাকে খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে একটা লম্বা শীতনিদ্রায় যাই I