ভয়ঙ্কর মৃত্যুনেশার নাম “টিকটক”

এ মৃত্যুনেশা বন্ধের দাবি সচেতন মহলের 

এস এম জামান, এটিভি সংবাদ 

ভয়ঙ্কর মৃত্যুনেশার নাম টিকটক। সামাজিক অবক্ষয়, পড়াশোনায় অমনোযোগী, ঊশৃংখল চলাফেরা সবকিছুর বিশ্লেষণে দাঁড়ায় ভয়ঙ্কর অনলাইনে ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফরম টিকটক।

দেশে চলতি বছরে অনলাইনে ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফরম টিকটক বানাতে গিয়ে ১০ জন তরুণ-তরুণী প্রাণ হারিয়েছে। বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশনের বার্তা প্রতিবেদনে লক্ষ্য করা যায়, গত কয়েক বছর যাবৎ চীনা শর্ট ভিডিও মেকিং প্ল্যাটফরম টিকটকের অপব্যবহার এতটা বেড়েছে যে, বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মৃত্যুফাঁদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে টিকটক। পাড়া-মহল্লায় টিকটক নিয়ে কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে। এজন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। ওই কমিটিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীকে চেয়ারম্যান এবং কমিশনের কোনো সদস্য বা সচিবকে সদস্য করার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন। তাদের দাবি, এ নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে টিকটকের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে সংগঠনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ এটিভি সংবাদকে বলেন, এত তরুণ-তরুণীর মৃত্যুর কারণ টিকটক হলেও এখন পর্যন্ত টিকটক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো অভিভাবক বাংলাদেশে মামলা করেনি। টিকটক বাংলাদেশের লাইসেন্সধারী কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে অথচ সরকার এই প্ল্যাটফরম থেকে কোনো প্রকার রাজস্ব পায় না।

বরং বিভিন্ন সময় দেখা যায় প্রধানমন্ত্রীর ছবি বা বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গের ছবি কেউ টিকটক ভিডিও বানাতে ব্যঙ্গাত্মক রূপে প্রকাশ করা হয়। ইতিমধ্যে আমরা জানতে পেরেছি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী টিকটক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

কিন্তু পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে করে এই প্ল্যাটফরম বন্ধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করি। টিকটককে মৃত্যুফাঁদ হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন জানিয়েছে, গত ৮ই জুলাই নোয়াখালীর চাটখিলে টিকটক ভিডিও বানানোর সময় অসাবধানতাবশত পা পিছলে গেলে সানজিদা আক্তার নামে (১১) বছর বয়সী এক কিশোরীর মৃত্যু হয়। এর কয়দিন পরই কুমিল্লায় চলন্ত ট্রেনের ছাদে টিকটক করতে গিয়ে পা পিছলে ১৫ বছর বয়সী মেহেদী হাসান নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়।

এ ছাড়া ২০১৯ সালের মার্চ মাসে টিকটক ভিডিও আপলোডকে কেন্দ্র করে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আরাফাত খুন হয়। গত ২রা মার্চ রাজবাড়ী জেলার কালুখালি উপজেলায় টিকটক করতে গিয়ে রেলের নিচে কাটা পড়ে মৃত্যু হয় হোসেন (১৬) নামের এক কিশোরের। ৮ই মে নড়াইলের কালিয়ায় টিকটক করতে বাধা দেয়ায় মায়ের সঙ্গে অভিমান করে কীটনাশক পানে আত্মহত্যা করে সুমি আক্তার (১৯)। ১৬ই মে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার শহরের লাল ব্রিজের কাছে হৃদয় (১৫) নামে এক কিশোর বিকাল ৫টার দিকে খুলনায় নকশি কাঁথা এক্সপ্রেস ট্রেনের সামনে টিকটক বানাতে গিয়ে কাটা পড়ে।

২২ মে নীলফামারীর সৈয়দপুরে টিকটক করতে গিয়ে নদীতে ডুবে মৃত্যু হয় মুস্তাকিম ইসলাম (১৬) নামে এক কিশোরের। গত বছর ২০ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জে টিকটক ভিডিও বানাতে গিয়ে নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে অনিল (১৪) নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয়। এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- তরুণ- তরুণীদের মৃত্যুর দায়ভার কোনোভাবেই টিকটক কর্তৃপক্ষ এড়িয়ে যেতে পারে না। এর দায়ভার তাদেরকে নিতে হবে। এ ছাড়াও আরও অনেক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে টিকটক বানাতে গিয়ে যার সঠিক কারণ নির্ণয় না হওয়া এবং প্রকাশ না পাওয়ায় নাম পরিচয় তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। গত বছরে টিকটক বানানোর প্রলোভনে ভারতে তরুণী পাচার করা হয়েছিল। গত বছরের জুন মাসে টিকটকের ফাঁদে ফেলে এক তরুণীকেও ধর্ষণ করা হয়। এদিকে টিকটক চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশিদের ৩৪ লাখের বেশি ভিডিও সরিয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত টিকটকের কমিউনিটি গাইডলাইন্স এনফোর্সমেন্ট রিপোর্টে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিকটকের কমিউনিটি গাইডলাইন লঙ্ঘনের জন্য বাংলাদেশিদের ৩৪ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫৬টি ভিডিও সরানো হয়েছে। এ সময় বিশ্বজুড়ে সরানো হয়েছে ১০ কোটি ২৩ লাখ ৫ হাজার ৫১৬টি ভিডিও। টিকটক কর্তৃপক্ষ বলেছে, তাদের কমিউনিটি গাইডলাইন্স এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে গ্রাহকদের বিনোদনের অভিজ্ঞতা নেয়ার সুযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তবে তা হতে হবে নিরাপত্তা, সমাজের সব ধরনের মানুষের অন্তর্ভুক্তি ও বস্তুনিষ্ঠতার ভিত্তিতে। এ সময় বিশ্বজুড়ে সরানো হয়েছে ১০ কোটি ২৩ লাখ ৫ হাজার ৫১৬টি ভিডিও।

টিকটক কর্তৃপক্ষ আরও বলেছে, সব ধরনের গ্রাহক এবং সব কনটেন্টের জন্য তাদের মূল নীতিগুলো প্রযোজ্য। এসব নীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে তারা অবিচল ও সমতা বজায় রাখেন।

টিকটক কর্তৃপক্ষ তাদের মূলনীতিতেই আছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে টিকটক কর্তৃপক্ষকে কোনক্রমেই দোষারোপ করবো না। আমি দোষারোপ করবো আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে, দোষারোপ করবো তরুণ-তরুণীদেরকে যারা পড়াশোনা বাদ দিয়ে নোংরা এ মরণনেশায় পতিত হয়েছে। সংসার ধ্বংস হচ্ছে এ মরণনেশা নামক টিকটকের কারণে। অসভ্যতায় পরিণত হয়েছে ছেলেমেয়েরা। শুনছে না তারা অভিভাবকদের কথা, আর এ কারণেই মহাবিপদে পড়েছে সচেতন অভিভাবকেরা। সরকার প্রধানের কাছে তাদের দাবি যে মরণনেশা টিকটক আমাদের সমাজকে কলুষিত করে, শিক্ষাকে দেয় জলাঞ্জলি, ধ্বংস হয় যুব সমাজের তরুণ-তরুণীরা। যে কারণে সচেতন মহল চাচ্ছেন মরণনেশা টিকটক এদেশ থেকে চিরদিনের জন্য হোক বিদায়।