নিরাপদ খাদ্য ও বর্তমান প্রেক্ষাপট!

এস এম জামান, এটিভি সংবাদ 

বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। সু-স্বাস্থ্যের জন্য আমাদের প্রত্যেকের প্রয়োজন নিরাপদ খাদ্য সুরক্ষা তথা পুষ্টিকর খাদ্যদ্রব্য। ভেজালের ভিড়ে নির্ভেজাল এমন পুষ্টিকর খাদ্যদ্রব্য আছে কি?

প্রকৃত অর্থে খাবার হচ্ছে আমাদের শরীরের জ্বালানি। মানুষের জীবনধারণের জন্য যত মৌলিক চাহিদা রয়েছে, খাদ্য হচ্ছে প্রধানতম মৌলিক চাহিদা। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, সচেতন-অসচেতন সবাইকে খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। সু-স্বাস্থ্যের জন্য প্রত্যেক মানুষের প্রয়োজন নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য। সুস্থ-সবল, মেধা-মননশীল, প্রত্যয়দীপ্ত সমৃদ্ধিশালী জাতি গঠনে নিরাপদ খাদ্য সুরক্ষা অপরিহার্য। বর্তমান সময়ে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়া রীতিমতো দুর্লভ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা ক্ষতিকর রাসায়নিক, অনিরাপদ, অস্বাস্থ্যকর ভেজাল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নিঃসন্দেহে তারা অমানবিক হত্যাকারীর মতোই সমান অপরাধে অপরাধী। অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশে খাবার তৈরি, বাজারজাত করা ইত্যাদি থেকে শুরু করে যেকোনো স্তরে ক্ষতিকর জীবাণুযুক্ত, বিষাক্ত, দূষিত অনিরাপদ খাবার খেয়ে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি বাড়ছে স্বাস্থ্য ব্যয়।

ksrm

খাদ্যে ভেজালের পাশাপাশি ভেজাল ওষুধ দেশে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করছে। ভেজালের রাজত্বে মানব জীবন এখন বিপন্ন প্রায়। স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। কিডনি, লিভার, রক্তচাপ, রক্তশূন্যতা, ক্যান্সার, জন্ডিস, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, জন্মগত ত্রুটি, প্যারালাইজড, ব্রেইন স্ট্রোকের মতো দুরারোগ্য অসুখ-বিসুখ হচ্ছে হরহামেশা। মেয়াদহীন খাবার, খাবারে বিষাক্ত অস্বাস্থ্যকর কৃত্রিম রং ও রাসায়নিক পদার্থ মানবদেহের জন্য নীরব ঘাতক। শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া অ্যালার্জি, অ্যাজমা, চর্মরোগ, মাথা ব্যথা, পেটের সমস্যা, খাবারে অরুচি ইত্যাদি সমস্যা হয়ে থাকে।

ফলমূল, শাক-সবজি, মাছ, মসলা, গুড়, মুড়িসহ নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব খাবারে ভেজাল মিশিয়ে থাকে নীতি-নৈতিকতাহীন, অতিমুনাফালোভী এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি, সামান্যতম মুনাফার বশীভূত হয়ে, টাকার নেশায় মত্ত হয়ে। এ ক্ষেত্রে বলা খুব প্রাসঙ্গিক যে শিশু খাবারও এই ভয়াল থাবা থেকে মুক্ত নয়। জাতি হিসেবে অশনিসংকেত হচ্ছে, ভেজাল খাবার খেয়ে শিশু-কিশোর, যুবসমাজ মেধাহীন অসুস্থ ও শারীরিক-মানসিকভাবে বেকারগ্রস্ত হয়ে দক্ষ মানবসম্পদ না হয়ে দেশের বোঝা হচ্ছে।

২০২০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটজনিত হৃদরোগে মৃত্যুর পরিসংখ্যান অনুযায়ী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ২০২৩ সালের মধ্যে ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সব সদস্য রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ শুধু দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়। এ কারণে প্রতিবছর মারা যায় প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষ। এ ছাড়া পাঁচ বছরের চেয়ে কম বয়সী শিশুর ৪৩ শতাংশই খাবারজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। ক্যান্সারের মতো ভয়ংকর এমন দুই শতাধিক রোগের জন্যও দায়ী অনিরাপদ খাবার। আমরা যে খাবার খেয়ে থাকি তা বিভিন্নভাবে দূষিত হয়ে থাকে উৎপাদনকালে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার সময়। এটি এখন মানবসভ্যতার বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে ভেজাল নির্মূলের কথা উল্লেখ আছে। ২৫(গ)-এর ১(ঙ) ধারায় খাদ্যে ও ওষুধে ভেজাল মেশানো বা ভেজাল পণ্য বিক্রি করলে বা বিক্রির জন্য প্রদর্শন করলে অপরাধী ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১৪ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

সর্বত্র ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যে সয়লাব। খাঁটি জিনিস এখন মেলা বড় ভার। উৎপাদন, আহরণ থেকে শুরু করে শেষ অবধি ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর প্রতিটি পর্যায়ে ভেজালের ছোঁয়া আছেই। সবশেষে বলতে হয় ভেজালের ভিড়ে আমাদের বাস। দেশে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ভেজাল নির্মূলের কথা উল্লেখ থাকলেও কেন হচ্ছেনা এর সঠিক বাস্তবায়ন?

যেভাবে দেশে হাটি হাটি পা পা করে ভেজাল নির্মূলের কাজ চলছে, তাতে হাজার বছরেও হবে না এর অবসান। সুতরাং সরকার প্রধানকেই জোরালো সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অন্যথায় লাখ লাখ মানুষের জীবন ধ্বংস হবে শুধুমাত্র ভেজাল খাদ্যদ্রব্যের কারণে।