অনুসন্ধানী প্রতিবেদক, এটিভি সংবাদ
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মীরগঞ্জ ফেরিঘাটটি তিন উপজেলার অন্তত ১৫ লাখ মানুষের যাতায়াতের পথ। এ ঘাটে প্রতিদিন ফেরি পারাপারের টিকেট ছাড়াই যাত্রীদের কাছ থেকে অস্বাভাবিকভাবে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
বরিশাল জেলা পরিষদের ইজারার নামে যাত্রী, তার সঙ্গে থাকা সরঞ্জাম ও যানবাহনের জন্য আদালাভাবে চাঁদা নেয়া হয়। দিন শেষে চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় কয়েক লাখ টাকা।
আড়িয়াল খাঁ নদীতে অবস্থিত মীরগঞ্জ ফেরিঘাটটি বরিশাল বিভাগীয় ও জেলা শহর এবং রাজধানী ঢাকার সঙ্গে ৩টি উপজেলার বাসিন্দাদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। সড়কপথে যাতায়াত করা প্রতিদিন অন্তত ২০ হাজার মানুষ এ ঘাট ব্যবহার করেন। ইজারার নামে ঘাটে কোনো টিকেট ছাড়াই জনপ্রতি ২০/২৫ টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হয়। এ ছাড়া মোটরসাইকেল প্রতি ৬০ টাকা যদি হাতে কোনপ্রকার মালামাল বা বস্তা থাকে সে ক্ষেত্রে দিতে হয় অতিরিক্ত ৫০ থেকে ১০০ টাকা।
ঘাটের মুলাদী উপজেলার পাড়ে কাঠের বেঞ্চ ও চেয়ার-টেবিল বসিয়ে ইজারাদারের পক্ষে ৮ থেকে ১০ জন মিলে এ চাঁদা আদায় করেন। স্থানীয়রা জানান, একটি অসাধু চক্রসহ মুলাদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান তারিকুল হাসান মিঠু তার ছোট ভাই টিপু হাসান খানের নামে ঘাট ইজারা নিয়ে নিজেই চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন।
ইজারার বিষয়ে জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী ঘাটে রেট চার্ট থাকতে হবে। যাত্রীপ্রতি ৭ টাকার বেশি নেয়া যাবে না এবং ওই টাকার মধ্যেই ট্রলারে খেয়া পারাপারের সুযোগ থাকতে হবে। বহনযোগ্য মালামালের জন্য কোনো টাকা নেয়া যাবে না। এ নিয়ম যদি সরকারীভাবে বরাদ্দ হয়ে থাকে, তাহলে এখানে হচ্ছেটা কি?
গতকাল (৩ জুলাই) এটিভি সংবাদের অনুসন্ধানে দেখা যায়, কোনো রেট চার্ট বা টিকেট ছাড়াই চাঁদা তোলা হচ্ছে। মোজাম্মেল নামে স্থানীয় এক যাত্রী বলেন, প্রতিবাদ করে কোন লাভ হবেনা কারণ প্রশাসনের চোখের সামনে এ অনিয়ম চলছে কিন্তু তারা নির্বাক। একটি অদৃশ্য শক্তির কারণে কেউ জোরালো প্রতিবাদও করতে চান না।
৪০ টাকা দিয়ে স্পীড বোটে নদী পার হন সাইফুল নামের একজন। ঘাটে তার কাছে ২০ টাকা দাবি করেন চাঁদা আদায়ে নিয়োজিত ব্যক্তিরা। সাইফুল তখন টিকেট চাইলে চাঁদা আদায়কারীরা তাকে জানান, টিকেট ছাড়াই ফেরিঘাটে টাকা নেয়ার নিয়ম আছে। জেলা পরিষদ থেকে ২ কোটি টাকা দিয়ে ফেরিঘাটের ইজারা নিতে হয়েছে সুতরাং এভাবে টাকা না নিলে মালিকপক্ষের ইজারার আসল টাকাই উঠবে না।
এ বিষয়ে মুলাদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান তারিকুল হাসান মিঠুর সাথে মুঠোফোনে (০১৭১১-১৮৬১১২) কথা বলেন, এটিভি সংবাদ ডটকম’র সম্পাদক এস এম জামান। তিনি বলেন, আমার জানামতে ফেরিঘাট ইজারায় কোনো টিকেটের ব্যবস্থা চালু নাই। তবে তিনি স্বীকার করেন ফেরিঘাটে অনেক অনিয়ম, দুর্নীতি ও জনদুর্ভোগ হচ্ছে। মুলাদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান তারিকুল হাসান মিঠু এটিভি সংবাদের সম্পাদককে পরামর্শ দেন, বিষয়টি জরুরীভাবে চেয়ারম্যান বরিশাল জেলা পরিষদসহ নির্বাহী প্রকৌশলী সড়ক ও জনপথ বিভাগ বরিশালকে জানাতে।
উল্লেখিত বিষয়টি নিয়ে বরিশাল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীরের ব্যবহৃত মুঠোফোনে (০১৭১১-১০৮৯০৯) ফোন করা হলেও পাওয়া যায়নি তাঁকে।
এটিভি সংবাদের পক্ষ থেকে বাবুগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী ইমদাদুল হকের সাথে মুঠোফোনে কথা হয় মীরগঞ্জ ফেরিঘাটের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে। তিনি এটিভি সংবাদকে বলেন, যেহেতু ফেরির বিষয়ে ইজারা দিয়ে থাকেন জেলা পরিষদ সে ক্ষেত্রে সার্বিক দেখভালের দায়িত্ব থাকে তাদেরই। আরো বলেন, এ অনিয়ম আজকের নয় চলে আসছে বহুকাল যাবত।
এ বিষয়ে সর্বশেষ জানতে চেয়ে ফোন করা হয় বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এর ব্যবহৃত মুঠোফোন (০১৩১৮-২৫৬৩৩১) নম্বরে। ফোন রিসিভ করেন সুব্রত বিশ্বাস নামের একজন। তিনি বলেন, ইউএনও নুসরাত ফাতিমা স্যার গত ২৮ জুন বদলী হয়েছেন। ফেরিঘাটের অনিয়মের বিষয়টি তিনি জানেন এবং এটিভি সংবাদকে বলেন, আমি বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় চাকুরি করেছি, ফেরিঘাটের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয় সকলে অবগত থাকলেও কোন প্রতিকার নেই।
পরিশেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাই এ ভয়াবহ চাঁদাবাজির শেষ কোথায়? শেখ হাসিনার স্বপ্নের বাংলাদেশে কোন অনিয়মকে প্রশ্রয় দেয়া হয়না সেখানে দিনদুপুরে এ ধরণের অনিয়ম ও চাঁদাবাজিকে কে প্রশ্রয় দিবে? সুতরাং এ চাঁদাবাজি ও অনিয়মের দায় কেউ এড়াতে পারেন না।
আমরা চাইবো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জোরালো হস্তক্ষেপ। তা নাহলে গোটা জাতির কাছে এক বিরাট প্রশ্নবোধক আড়িয়াল খাঁ নদীতে অবস্থিত মীরগঞ্জ ফেরিঘাট!