বাসিত চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একজন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে রাষ্ট্রকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশেষায়িত ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় এই ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বেশি। দেশের সাধারণ মানুষের করের টাকায় এই ব্যয় মূলত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে রাষ্ট্রের একটি বড় বিনিয়োগ। তবে এই বিশাল ব্যয়ের পার্থক্যের পেছনের কারণ এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
২০২২ সালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষার্থীপ্রতি বার্ষিক ব্যয়ের তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্রের বার্ষিক মাথাপিছু ব্যয় ৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। প্রায় সমান পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতেও। তালিকায় পরবর্তী স্থানগুলোতেও রয়েছে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো; এর মধ্যে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৮১ হাজার টাকা এবং খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বুয়েটে মাথাপিছু ব্যয় ৩ লাখ ১৪ হাজার ৪৭৭ টাকা। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ব্যয় ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৭ টাকা। বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ১ হাজার ৭৭৮ টাকা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ লাখ ১৯ হাজার ৩০৯ টাকা এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ব্যয় করে রাষ্ট্র। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ব্যয়ের পরিমাণ ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৭০ টাকা। প্রকৌশল ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও ব্যয়ের ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। ডুয়েটে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় ২ লাখ ১৭ হাজার ৭৯৫ টাকা, রুয়েটে ১ লাখ ৩৯ হাজার ১৯ টাকা এবং চুয়েট ও কুয়েটে গড়ে ১ লাখ ১২ হাজার থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা এবং নোবিপ্রবিতে ১ লাখ ২৪ হাজার ২৩১ টাকা ব্যয় করে রাষ্ট্র।
এই বিশাল ব্যয়ের পার্থক্য শুধুমাত্র অবকাঠামো বা ল্যাবরেটরি খরচের কারণেই নয়, বরং শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, প্রশাসনিক ব্যয় এবং গবেষণার সুযোগের ওপরও নির্ভর করে। বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যবহারিক ক্লাস এবং মাঠ পর্যায়ের গবেষণার প্রয়োজনীয়তা থাকায় স্বভাবতই খরচ বেশি। অন্যদিকে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর কারণে মাথাপিছু ব্যয় কমলেও, অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত শিক্ষার অভাব দেখা দেয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই চিত্র সবচেয়ে করুণ; যেখানে শিক্ষার্থীপ্রতি বার্ষিক গড় ব্যয় মাত্র ৭০২ টাকা। এটি শিক্ষার মানের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট তৈরির লক্ষ্য কতটা সফল হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষার এই বিশাল ব্যয় মূলত দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রের একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ। যেহেতু এই অর্থের সিংহভাগই আসে সাধারণ মানুষের কর থেকে, তাই একজন গ্র্যাজুয়েট তৈরি হওয়া কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এটি একটি বড় সামাজিক দায়বদ্ধতাও। রাষ্ট্রের এই বিনিয়োগের সুফল পেতে শুধুমাত্র শিক্ষার্থী প্রতি ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ানোই নয়, বরং শিক্ষার মান নিশ্চিত করা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত কমানো এবং গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করার দিকেও নজর দিতে হবে। তবেই প্রকৃত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে, যারা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।