এস এম জামান, এটিভি সংবাদ /
চিকিৎসা খাতের নিয়মনীতি ও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক তথ্য ও স্বাস্থ্যখাতের বিশ্লেষণে যে চিত্রটি সামনে এসেছে, তা কেবল উদ্বেগের নয়, বরং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার আইনি ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বাধ্যতামূলক ‘ডেঞ্জারাস ড্রাগস’ বা ‘ডিডি লাইসেন্স (DD License)’ ছাড়াই। অথচ আইন অনুযায়ী, সিজারিয়ান সেকশন (C-Section) কিংবা যেকোনো মেজর বা বড় অপারেশন পরিচালনার জন্য এই লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যাথানাশক বা অ্যানেশেস্টিসিয়ায় ব্যবহৃত কিছু শক্তিশালী ওষুধ (যেমন—মরফিন, পেথিডিন, ফেন্টানিল ইত্যাদি) ‘Dangerous Drugs’ বা কড়া নিয়ন্ত্রণমূলক মাদক হিসেবে তালিকাভুক্ত। এ ধরনের জীবনরক্ষাকারী ও সংবেদনশীল ওষুধ বৈধভাবে সংরক্ষণ, ক্রয়, ব্যবহার ও সরবরাহের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে বিশেষ অনুমতি বা ডিডি (পজেশন) লাইসেন্স নিতে হয়।
নিয়ম অনুযায়ী, সিজার বা মেজর সার্জারির সময় রোগীকে অজ্ঞান করতে বা ব্যথানাশক হিসেবে যেসকল ওষুধ ব্যবহার করা হয়, তার একটি বড় অংশ এই নিয়ন্ত্রণাধীন ডেঞ্জারাস ড্রাগস-এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং, কোনো প্রতিষ্ঠানে বৈধ অপারেশন থিয়েটার (OT) থাকতে হলে এবং সেখানে বড় ধরনের সার্জারি করতে হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এই লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক।
খাতসংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দেশের সিংহভাগ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক এই লাইসেন্স ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু কারণ!
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা লাইসেন্স প্রদানকারী অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সাথে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমন্বয়হীনতা ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাব।
লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বিভিন্ন শর্ত পূরণের ঝামেলার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নেওয়ার আগ্রহ দেখায় না।
অনেক ক্লিনিক মালিক মনে করেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স বা পরিবেশ ছাড়পত্র থাকলেই বুঝি সব ধরনের চিকিৎসা ও সার্জারি করা বৈধ। মাদকদ্রব্যের লাইসেন্সের বিষয়টি অনেকেই এড়িয়ে যান।
ডিডি লাইসেন্স ছাড়া হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অপারেশন পরিচালনার বিষয়টি বহুমাত্রিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
লাইসেন্স ছাড়া কড়া নিয়ন্ত্রণমূলক ড্রাগস বা মাদকদ্রব্যের ক্যাটাগরির ওষুধ নিজের হেফাজতে রাখা বা ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এর ফলে যেকোনো সময় আইনি ব্যবস্থার মুখে পড়তে পারে এসব প্রতিষ্ঠান।
হাসপাতালগুলোতে এসব সংবেদনশীল ওষুধের সঠিক হিসাব ও রেজিস্টার সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা থাকে। লাইসেন্স না থাকলে এসব ওষুধে নজরদারির অভাব ঘটে, যা অপব্যবহার বা অবৈধ বাজারে চলে যাওয়ার বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানে অনেক সময় অদক্ষ ও অনিবন্ধিত লোকজনের মাধ্যমে এসব ড্রাগস হ্যান্ডেল করা হয়, যা রোগীদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের চিকিৎসা খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এই অনিয়ম কঠোরহস্তে দমন করা জরুরি। একটি পূর্ণাঙ্গ ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাকেন্দ্রে কী পরিমাণ এবং কী ধরনের ওষুধ ব্যবহার হচ্ছে, তার স্বচ্ছ হিসাব থাকা দরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিজার ও বড় অপারেশনের মতো সংবেদনশীল চিকিৎসা সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বা ডিডি লাইসেন্স আছে কি না, তা যৌথভাবে খতিয়ে দেখা উচিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে যৌথভাবে দেশজুড়ে ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোতে অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
প্রকৃত ও বৈধ চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর জন্য ডিডি লাইসেন্স প্রাপ্তির প্রক্রিয়াটি সহজ ও অনলাইনভিত্তিক করা উচিত, যাতে আইনি প্রক্রিয়ায় আসতে হাসপাতালগুলো উৎসাহিত হয়।
লাইসেন্সবিহীন যেসব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সিজার বা মেজর অপারেশন অব্যাহত রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা (যেমন—প্রতিষ্ঠান সিলগালা বা জরিমানা) গ্রহণ করা আবশ্যক।
দেশের মানুষের দোরগোড়ায় নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে হলে লাইসেন্সহীন ও অনিয়ন্ত্রিত হাসপাতালগুলোর এই নৈরাজ্য অবিলম্বে বন্ধ করা সময়ের দাবি।
এটিভি/এস এম জামান/অনুসন্ধানী পর্ব-১