চট্টগ্রামের বাদুড়তলা এলাকায় প্রায় ১০ কাঠা জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, জমির ওপর থাকা একটি চারতলা ও একটি পাঁচতলা ভবনে বসবাসকারী প্রায় ১৫টি ভাড়াটিয়া পরিবারকে অত্যন্ত অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এ সময় ঘরের আসবাবপত্র ও অন্যান্য মালামাল ভাঙচুর এবং কিছু মালামাল নিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। পরিবারগুলোর দাবি, পুলিশের উপস্থিতিতে একদল বেসামরিক লোক ভবন দুটিতে প্রবেশ করে দ্রুত বাসিন্দাদের বের করে দেয়। অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় মালামাল নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময়ও দেওয়া হয়নি। আকস্মিক এ উচ্ছেদে নারী, শিশু ও বয়স্করা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেন তারা। মাত্র ২০ লাখ টাকায় ১০ কাঠা জমি নিলাম নিয়ে প্রশ্ন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি, অগ্রণী ব্যাংকের একটি ঋণসংক্রান্ত মামলার সূত্র ধরে প্রায় ১০ কাঠা জমি মাত্র ২০ লাখ টাকায় নিলাম করা হয়েছে। তবে তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ঋণের বকেয়া অর্থ ২০১২ সালেই গ্যারান্টার আব্দুল মাবুদ পরিশোধ করেছিলেন। এ অবস্থায় ঋণ পরিশোধের পরও কীভাবে সম্পত্তিটি নিলামে গেল—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। পরিবারের আরও অভিযোগ, সম্পত্তির মালিক পাঁচটি পরিবারের কেউই নিলাম বা দখলসংক্রান্ত যথাযথ নোটিশ পাননি। পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেট এসে সম্পত্তির দখল বুঝিয়ে দেন বলেও তারা দাবি করেছেন। নিলামের বাইরের ৪০২ দাগ নিয়েও অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, নিলামে অন্তর্ভুক্ত জমির বাইরেও ৪০২ দাগের জমি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের আরও দাবি, ৪০১ নম্বর দাগটি ২০১২ সালের পূর্বের নিলাম পর্চায় ৪১০ নম্বর দাগ হিসেবে উল্লেখ ছিল। পরবর্তীতে এফিডেভিটের মাধ্যমে সেটি ৪০১ করা হয়েছে—এমন গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন তারা। পরিবারগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৩ আগস্ট বিপুলসংখ্যক লোকজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। একই সময়ে ১৪৫ ধারার কার্যক্রম চলমান থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। চৌধুরী সানিয়া আলম ও সেলিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো চৌধুরী সানিয়া আলম ও তার স্বামী সেলিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে দখল ও উচ্ছেদ কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছে। তাদের অভিযোগ, উচ্ছেদের সময় বাসিন্দাদের ওপর অমানবিক চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং ভবনের বিভিন্ন মালামাল ভাঙচুর করা হয়। নারী ও শিশুদের ওপরও হামলার অভিযোগ করেছেন তারা। পরিবারগুলোর দাবি, গত ২৩ আগস্ট স্বজনরা ঘটনাটির প্রতিবাদ করতে গেলে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে হামলা করা হয়। এতে বাসার দারোয়ানসহ অন্তত পাঁচজন গুরুতর আহত হন এবং তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পুরো ঘটনার সঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের চকবাজার শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। তাদের প্রশ্ন—২০১২ সালে ঋণের অর্থ পরিশোধ করা হয়ে থাকলে ব্যাংকের নথিতে তার প্রতিফলন কীভাবে হয়েছে? পরবর্তীতে কোন প্রক্রিয়ায় জমিটি নিলামে গেল? সম্পত্তির মালিকদের যথাযথ নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কি না? নিলামের মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল? এবং দখল বুঝিয়ে দেওয়ার সময় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল? ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যাংকের নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। ### পুলিশের উপস্থিতিতে উচ্ছেদ, আইনগত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে উচ্ছেদ কার্যক্রমের পদ্ধতি নিয়ে। আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ উপস্থিত থাকলেও বেসামরিক ব্যক্তিরা যদি ভবনে প্রবেশ করে মালামাল ভাঙচুর বা জোরপূর্বক বাসিন্দাদের বের করে দিয়ে থাকে, তাহলে ওই সময় পুলিশের ভূমিকা কী ছিল—তা তদন্তের দাবি রাখে বলে মনে করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। তাদের প্রশ্ন, আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কি নির্ধারিত আইনগত প্রক্রিয়া এবং মানবিকতার ন্যূনতম মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছিল? ### আগের ঘটনাতেও একই ধরনের অভিযোগ উল্লেখ্য, চৌধুরী সানিয়া আলম ও সেলিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে এর আগেও চট্টগ্রামের কাতালগঞ্জ এলাকায় একটি বিহারি পরিবারের প্রায় ১০ কাঠা সম্পত্তি দখলের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। তবে ওই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। রায় ও আদালত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন মামলাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের একজন আইনজীবী দাবি করেছেন, মামলাটির রায় যথাযথ আইন প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও প্রমাণাদি পূর্ণাঙ্গভাবে পর্যালোচনা ও নিরীক্ষার মাধ্যমে দেওয়া হয়নি। তার ভাষ্য, রায় প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু গুরুতর আইনি ঘাটতি ও অসঙ্গতি রয়েছে। মামলার গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়ে আদালতকে একতরফা সিদ্ধান্তের দিকে প্রভাবিত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন। ওই আইনজীবীর দাবি, মামলার রায়ের পেছনে কোনো পরিকল্পিত কৌশল, প্রভাব কিংবা স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। স্বচ্ছ তদন্তের দাবি ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি, তারা কোনো পক্ষের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চান না। তারা শুধু নিলাম, ঋণ পরিশোধ, নোটিশ, দখল ও উচ্ছেদের পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত তদন্ত চান। তাদের ভাষ্য, একটি সম্পত্তি নিয়ে আইনি বিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই বিরোধের কারণে একসঙ্গে প্রায় ১৫টি পরিবারকে অল্প সময়ের মধ্যে আশ্রয়হীন করে দেওয়া এবং তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা হলে বিষয়টি শুধু ভূমি বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি একটি গুরুতর মানবিক ও আইনি প্রশ্নে পরিণত হয়। এ ঘটনায় নিলাম প্রক্রিয়া, ব্যাংকের নথিপত্র, ঋণ পরিশোধের দাবি, সম্পত্তির দাগ ও পর্চা, আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন এবং উচ্ছেদের সময় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।