শরতের বিদায় আর হেমন্তের আবাহনে গাইবান্ধার গ্রামীণ জনপদে এখন উৎসবের আমেজ। নদ-নদীর জল কমতেই শুরু হয়েছে ‘বাওত’— যা বাংলার চিরায়ত লোকসংস্কৃতির এক অনন্য উৎসব। বর্ষার উথাল-পাথাল রূপ শেষে যমুনা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র আর ঘাঘটের বুক জুড়ে এখন বালুচরের হাতছানি। খাল-বিল, জলাশয় আর ডোবা-নালার বুক থেকে পানি নেমে যাওয়ার এই সন্ধিক্ষণে গ্রামীণ বাংলার মানুষ মেতে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী দলবদ্ধ মাছ শিকারের মহোৎসবে। শতাব্দীর প্রাচীন এই ‘বাওত’ কেবল মাছ ধরার আয়োজন নয়, এ যেন যান্ত্রিক জীবনের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ সৌহার্দ্য ও আনন্দের এক মহা-মিলনমেলা।
বর্ষার অবসান ঘটিয়ে কার্তিকের এই প্রহরে গাইবান্ধার বুক চিরে বয়ে যাওয়া জলাশয়গুলো ধারণ করেছে এক মায়াবী রূপ। একসময়ের প্রমত্তা বিল আর থৈ থৈ করা ডাহুক-ডাকা জলাশয়গুলো এখন রূপালী জলের শান্ত সরোবর। কুয়াশার চাদর জড়ানো সকালে বিলের স্থির পানি যেন এক বিশাল স্ফটিক আয়না, যেখানে প্রতিফলিত হচ্ছে সুনীল আকাশ। জলজ উদ্ভিদের সবুজ আস্তরণ, কলমি লতার দুলুনি আর শাপলা-শালুকের শেষ হাসি বিলের বুকে এনে দিয়েছে অলৌকিক স্নিগ্ধতা। পানি কমতেই উন্মুক্ত হওয়া পলিময় কাদা আর জলজ ঝোপঝাড় এখন দেশীয় মাছের শেষ আশ্রয়স্থল, যা গ্রামীণ মৎস্যশিকারীদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই গাইবান্ধার বিভিন্ন উপজেলার বিল ও জলাশয়ের পাড়ে জমায়েত হতে শুরু করে শত শত শৌখিন মানুষ। পলো, খয়রা জাল, ছিটকি জাল, আর ধর্ম জাল কাঁধে নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন আবালবৃদ্ধবনিতা। কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই, বংশপরম্পরায় চলে আসা নিয়মে নির্দিষ্ট দিনে শুরু হয় এই বাওত।
পলো হাতে শত শত মানুষের একসঙ্গে পানিতে নেমে পড়ার দৃশ্যটি যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। দলবদ্ধ শিকারীদের সমবেত চিৎকারে, আনন্দের হিল্লোলে আর পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে শান্ত বিলের চারপাশ। কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যাওয়া একেকটি মানুষের মুখে তখন ক্লান্তি নয়, বরং ফুটে ওঠে আদিম এক আনন্দ।
বাওত উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হলো ‘পলো’। বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি বিশেষ এই মৎস্যশিকার যন্ত্রটি গ্রামীণ কুটির শিল্পের এক অপূর্ব নিদর্শন। কোমর পানিতে নেমে সমতা বজায় রেখে একসঙ্গে পলো ফেলার দৃশ্যটি দেখার মতো। পলোর ভেতর মাছের সামান্যতম নড়াচড়া টের পেলেই শিকারীর চোখে-মুখে ফুটে ওঠে তীব্র উত্তেজনা। পলোর ভেতর হাত ঢুকিয়ে যখন বের করে আনা হয় বিশাল আকৃতির মাছ—তখন শিকারীর আনন্দের সীমা থাকে না। মাছটি উঁচিয়ে ধরার পর চারপাশ থেকে ভেসে আসে সমবেত করতালির আওয়াজ।
আধুনিকতার গ্রাসে এবং নদী-বিলের নাব্য হ্রাসের কারণে গ্রামীণ বাংলার অনেক ঐতিহ্যই আজ বিলুপ্তির পথে। কিন্তু গাইবান্ধার এই বাওত উৎসব প্রমাণ করে, বাঙালির শিকড়ের টান এখনো কতটা মজবুত। এই উৎসবের কোনো জাত-পাত নেই, ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ নেই। একই বিলে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে মাছ ধরছেন গ্রামের কৃষক, শহরের চাকুরিজীবী কিংবা প্রবাসী যুবক। এটি কেবল মাছ শিকারের প্রতিযোগিতা নয়, বরং পারস্পরিক সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং গ্রামীণ সম্প্রীতিকে টিকিয়ে রাখার এক নীরব আন্দোলন।
নদীতে জল কমার এই ঋতুতে গাইবান্ধার বিল-ঝিলগুলো যেন একেকটি আনন্দের মহোৎসবে রূপ নিয়েছে। প্রকৃতির এই উপহার আর পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে জলাশয়গুলোর নাব্য রক্ষা এবং উন্মুক্ত জলাশয়ে দেশীয় মাছের বংশবৃদ্ধির সুযোগ করে দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সচেতন মহল।