মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি লেগেই থাকে। কখনো মানুষ নিজের সামর্থ্যের সীমা বুঝে অসহায় হয়ে পড়ে, কখনো আবার জীবনের কঠিন বাস্তবতায় দিশাহারা হয়ে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তগুলোতেই বান্দা ফিরে যায় তার প্রকৃত আশ্রয়ের দিকে—আল্লাহর কাছে। আল্লাহর কাছে চাওয়া অর্থাৎ দোয়া, শুধু কিছু কথা বলা নয়, এটি হলো বান্দার অন্তরের গভীর বিশ্বাস, ভরসা ও আত্মসমর্পণের প্রকাশ।”
একজন মুমিন বিশ্বাস করে, তার প্রভু সব শোনেন, সব জানেন এবং সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাই বান্দার দোয়া ও প্রার্থনা আল্লাহ তাআলার কাছে খুব পছন্দ। আল্লাহ তাআলা চান, বান্দা নিয়মিত তাঁর কাছে দোয়া করুক। সব প্রয়োজন তাঁর কাছেই পেশ করুক।”
বান্দার এই আল্লাহমুখিতা ও মুখাপেক্ষিতা আল্লাহ তাআলার খুব প্রিয়। এ মর্মেই পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘তোমাদের রব বলেছেন, আমাকে ডাকো; আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয়ই যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, ওরা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।””(সুরা : গাফির, আয়াত : ৬০)”
এই আয়াতে ‘আমাকে ডাক’ অর্থ হলো আমার ইবাদত করো এবং আমার কাছে চাও।
আর ‘সাড়া দেব’ অর্থ হলো আমি তোমাদের ইবাদতের প্রতিফল দেব এবং তোমাদের দোয়া কবুল করব, তোমাদের চাওয়া পূর্ণ করব। (তাফসিরে কাশশাফ, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-১৭৫)আয়াতের শেষাংশে বলেছেন, যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত থেকে অর্থাৎ সব ইবাদত, দোয়া ও আল্লাহকে ডাকা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। নিঃসন্দেহে অন্যান্য ইবাদতের মতো আল্লাহকে ডাকা এবং তাঁর কাছে দোয়া করা স্বতন্ত্র একটি ইবাদত; বরং আল্লাহর কাছে চাওয়া ও দোয়া করাকে হাদিসে ইবাদতের মূল বলা হয়েছে।
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৭৯; জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩২৪৭)”
দোয়ার ক্ষেত্রে কিছু আদব যেমন আছে, তা কবুল হওয়ার কিছু শর্তও আছে। এ বিষয়ে অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়।”
যেমন বিখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা বান্দার দোয়া কবুল করে থাকেন, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো গুনাহ কিংবা আত্মীয়তা ছিন্ন করার দোয়া না করে এবং দোয়া কবুলে তাড়াহুড়া না করে।’ সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, তাড়াহুড়া কিভাবে হয়? অথবা কাকে তাড়াহুড়া বলা হয়? নবীজি বললেন, ‘বান্দা বলে, আমি তো দোয়া করেছি, আমি তো দোয়া করেছি; কিন্তু কবুল হতে দেখিনি। তাই সে নিরাশ হয়ে যায় এবং দোয়া করা ছেড়ে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭৩৫)
অন্য হাদিসে এসেছে, নবীজি (সা.) বলেন, ‘মানুষ যেকোনো দোয়া করে, যদি তাতে কোনো গুনাহ কিংবা আত্মীয়তা ছিন্ন করার বিষয় না থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে তিনটি বিষয়ের কোনো একটি দান করেন। হয়তো তৎক্ষণাৎ তার দোয়া কবুল করা হয় অথবা তার দোয়ার ফল আখিরাতের জন্য রেখে দেওয়া হয় কিংবা তাকে কোনো মন্দ বিষয় থেকে হেফাজত করা হয়। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, তাহলে তো আমরা অনেক দোয়া করব। নবীজি (সা.) বলেন, তাহলে আল্লাহও অনেক দেবেন এবং আল্লাহর দেওয়াই বেশি।’
(মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১১১৩৩)”
অতএব, দুনিয়া ও আখিরাতের যেকোনো প্রয়োজনে মুমিন প্রথমেই আল্লাহ অভিমুখী হবে। আল্লাহ তাআলার কাছেই নিজের সব প্রয়োজন পেশ করবে। তাঁর কাছ থেকেই কল্যাণের ফয়সালা গ্রহণ করবে। সে ক্ষেত্রে নামাজ ও দোয়ার মাধ্যম অবলম্বন করবে। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’
“(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৫৩)”
পাশাপাশি সাধ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। মনে রাখা উচিত আল্লাহ তাআলার কাছে বান্দার দোয়া ও মোনাজাতের যেমন প্রতিদান রয়েছে, চেষ্টা মেহনতেরও রয়েছে অনেক মূল্য ও প্রতিদান। নিঃসন্দেহে বান্দার সব বিষয় আল্লাহ তাআলার হুকুমেই সম্পন্ন হয়ে থাকে।