দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে বিএনপি এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। রাজপথের লড়াইয়ে রক্ত ঝরানো পরীক্ষিত ও তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মাঝে এখন দানা বাঁধছে তীব্র ক্ষোভ। দেশজুড়ে মাঠ পর্যায়ের চিত্র প্রায় একই—দলের দুঃসময়ে যারা বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন, সেই প্রকৃত নেতাকর্মীরা আজ অবহেলিত; আর পদ-পদবি ও ক্ষমতার অলিতে-গলিতে প্রভাব বিস্তার করছে বিতর্কিত ‘হাইব্রিড’ বা নব্য সুবিধাভোগী চক্র।
কেন এই ক্ষোভ? তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দলের দুঃসময়ে যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, আজ পরিস্থিতি অনুকূলে আসতেই তারা নানা কৌশলে দলের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছে। ‘হাইব্রিড’ হিসেবে পরিচিত এই নব্য সুবিধাভোগীরা মূলত তিনটি উপায়ে দলের ক্ষতি করছে;
অর্থের বিনিময়ে কিংবা লবিংয়ের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদ বাগিয়ে নিচ্ছে তারা। এর ফলে পরীক্ষিত কর্মীরা তাদের চেয়েও জুনিয়র বা নব্যদের অধীনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
নব্যদের অনেকের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাস প্রশ্নবিদ্ধ। তারা দলের আদর্শ ধারণ করার চেয়ে নিজস্ব প্রভাব বিস্তার ও ব্যক্তিগত ফায়দা লুটতেই বেশি তৎপর।
দীর্ঘদিন যারা হামলা, মামলা ও কারাভোগ করেছেন, তাদের মূল্যায়ন না করে বিতর্কিত ব্যক্তিদের তোষণ করা হচ্ছে। এতে তৃণমূলের লড়াকু সৈনিকদের মনোবল ভেঙে পড়ছে।
ঢাকার বাইরে বেশ কয়েকটি জেলা ও উপজেলার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে উঠে এসেছে হতাশার সুর। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক উপজেলা পর্যায়ের নেতা জানান, “যারা বিগত দিনগুলোতে আমাদের পিঠে লাঠির বাড়ি মেরেছে বা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছে, তারাই এখন হাইব্রিড সেজে দলের নেতাদের আশেপাশে ঘুরছে। আমরা যারা জীবন বাজি রেখে দল করেছি, আমরা আজ তাদের মুখাপেক্ষী।”
তৃণমূলের স্পষ্ট দাবি, দলকে শক্তিশালী করতে হলে হাইব্রিডদের চিহ্নিত করে তাদের দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। পকেট কমিটি বা তোষামোদকারী দিয়ে বড় কোনো লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই এটি একটি বড় সংকট। তৃণমূলের ক্ষোভের আগুন দীর্ঘস্থায়ী হলে তা দলের সাংগঠনিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে এখন দুটি বিষয়ের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে;
নতুন বা পুরোনো—যারা দলের পদ পেতে চায়, তাদের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড বা কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
যারা দুর্দিনে দলের পাশে ছিল, তাদের যথাযথ সম্মান ও দায়িত্ব দেওয়া। কর্মীদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম শক্তিশালী করা।
বিএনপির হাইকমান্ড বারবারই ‘ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়নের’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। তবে মাঠ পর্যায়ে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের গতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। দলের নীতিনির্ধারকরা কি তৃণমূলের এই চাপা ক্ষোভের আগুনের আঁচ টের পাচ্ছেন? যদি হাইব্রিডদের দৌরাত্ম্য এখনই রুখে দেওয়া না যায়, তবে দলের তৃণমূলের এই ক্ষত গভীর থেকে গভীরতর হবে, যা আগামী দিনে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।