এস এম জামান। এটিভি সংবাদ /
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব যে বাহিনীর ওপর ন্যস্ত, সেই গোটা পুলিশ বাহিনী নিয়ে জনমনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, হতাশা ও আস্থার সংকট রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে অপরাধ ও মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বারবার বলা হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, পুলিশ বাহিনীর বড় একটি অংশে এখনো ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং অপরাধের সাথে গোপন আঁতাতের সংস্কৃতি জাঁকিয়ে বসেছে।
মাদক নির্মূলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের কঠোর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও এর নেপথ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের সম্পৃক্ততার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
অভিযোগ রয়েছে, খুচরা মাদক বিক্রেতা থেকে শুরু করে গডফাদারদের একটি বড় অংশ নিয়মিত মাসোয়ারা বা চাঁদার বিনিময়ে পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের কাছ থেকে ‘সুরক্ষা বলয়’ পেয়ে থাকে।
মাঝেমধ্যে মাঠপর্যায়ের কিছু কনস্টেবল, এসআই (উপ-পরিদর্শক) মাদকসহ ধরা পড়লেও, এর পেছনে থাকা রাঘববোয়াল বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে মাদকের মূল রুট ও সিন্ডিকেটগুলো অক্ষত থাকে।
অনেক সময় জব্দ করা মাদক পুরোপুরি জমা না দেখিয়ে তা পুনরায় অন্য সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে কিছু অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
দেশের বেশিরভাগ থানায় ভুক্তভোগীরা মামলা করতে গেলে নানা টালবাহানার শিকার হন। আর মামলা হলেও অপরাধীরা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়ানোর নেপথ্যে কাজ করে ‘অদৃশ্য পেশীশক্তি’ ও রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব।
অনেক থানায় জিডি বা মামলা নিতে গড়িমসি করা হয়, যাতে অপরাধের পরিসংখ্যান কম দেখানো যায় এবং পুলিশের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।
মামলা রুজু হওয়ার পর চার্জশিট থেকে নাম কাটা, আসামিকে গ্রেপ্তার না করা বা আদালত থেকে দ্রুত জামিন পাইয়ে দেওয়ার পেছনে কাজ করে আর্থিক লেনদেন এবং শক্তিশালী লবিং। ফলে আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের ‘পায় না’ বলে দায় সারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের এমন দ্বিমুখী ভূমিকার কারণে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের শিকার ব্যক্তি থানায় বিচার চাইতে গেলে উল্টো পুলিশি হয়রানির শিকার হন কিংবা আসামিপক্ষের প্রভাবে ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধেই মিথ্যা মামলা দেওয়ার ঘটনা এদেশে অহরহ ঘটছে।
আইনি সহায়তার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে থানাকে বিবেচনা করা সাধারণ মানুষ যখন দেখেন পুলিশ নিজেই অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েছে, তখন সমাজে একধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়। এতে আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে, যা কখনোই কাম্য নয়।
বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীকে সত্যিকারের জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে কেবল প্রজ্ঞাপন বা বদলির রাজনীতি যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত ও মানসিক রূপান্তর। আদৌ কি সেটা হচ্ছে?
পুলিশ সদস্যদের সম্পদের হিসাব বিবরণী নিয়মিত যাচাই এবং অভ্যন্তরীণ মনিটরিং সেলকে আরও অধিক শক্তিশালী খুবই জরুরী।
কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক বা দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিললে তাকে কেবল বিভাগীয় শাস্তি (সাময়িক বরখাস্ত বা বদলি) না দিয়ে ফৌজদারি আইনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
সর্বপ্রথম থানাকে সব ধরনের রাজনৈতিক ও পেশী শক্তির প্রভাবমুক্ত রেখে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করা অতীব জরুরী। এ চিন্তাধারা কি সরকারের আছে?
জনগণের করের টাকায় চলা বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর মূল কাজ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু হাতে গোনা কিছু দুর্নীতিবাজ ও অসাধু কর্মকর্তার কারণে আজ পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এই সংকট উত্তরণে কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই একমাত্র উপায়।
আগামীতে আসছে পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম্য…