এস এম জামান, এটিভি সংবাদ //
দেশে সংক্রামক ব্যাধি হামের যে ভয়াবহতা দেখা দিয়েছে তা কেবল উদ্বেগজনক নয় বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল বড় হচ্ছে, যা কোনোভাবেই একটি স্থিতিশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিফলন হতে পারে না।
শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৭৭ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হওয়া এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ শিশুর মৃত্যুর খবর আমাদের বিচলিত করে। বিশেষ করে ১৫ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিলের মধ্যে ১৪৪ শিশুর প্রাণহানি এবং ১৩ হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজন রোগীর পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, পরিস্থিতি প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগে সংক্রমণের হার ও মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। রাজশাহী বিভাগে ৬৫ এবং ঢাকা বিভাগে ৫৯ জনের মৃত্যুর সংবাদ পুরোদস্তুর আতঙ্ক জাগানিয়া। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল ও পাবনার মতো জেলাগুলোয়ও শিশু আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ছে এবং হাসপাতালগুলোয় শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে পড়ছে। অর্থাৎ, দেশের একটি বিশালসংখ্যক শিশু এখন জীবনঘাতী এই ভাইরাসের কবলে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা সঠিক সময়ে টিকাদানের মাধ্যমে শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। প্রশ্ন জাগে, আমাদের টিকাদান কর্মসূচিতে কোথায় ঘাটতি রয়ে গেছে? কেন হাজার হাজার শিশু টিকার সুরক্ষাবলয় থেকে বাইরে রয়ে গেল? বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র যখন নানাবিধ সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন স্বাস্থ্য খাতের এই ভেঙে পড়া চিত্র কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এ সংকট নিরসনে কেবল আইসোলেশন ওয়ার্ডের শয্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। অবিলম্বে দেশজুড়ে ‘হাম-রুবেলা স্পেশাল ক্রাশ প্রোগ্রাম’ বা জরুরি টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করা জরুরি। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় এবং দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের পাঠাতে হবে, যাতে একটি শিশুও টিকার আওতার বাইরে না থাকে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে অভিভাবকরা হামের লক্ষণ দেখামাত্রই আতঙ্কিত না হয়ে নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করেন।
সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে এই মহামারিতুল্য পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। বিভাগীয় ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে ওষুধের সরবরাহ এবং চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করা এখনই প্রয়োজন। আমাদের অবহেলায় আর কোনো শিশুর প্রাণ ঝরে যাক, তা দেশবাসী দেখতে চায় না। হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ। অথচ অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতির কারণে শিশুদের প্রাণ যাচ্ছে। হামের এই প্রাদুর্ভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয়-জনস্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা মানে জাতির ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। কাজেই এখনই সময় গাফিলতি নয়, দায়িত্বশীলতা দেখানোর।