কক্সবাজার প্রতিবেদক, এটিভি সংবাদ
কক্সবাজারে ২৪ ঘণ্টায় শিশুসহ সাত লাশ উদ্ধার এ নিয়ে জেলায় ২০ জনের লাশ উদ্ধার , এক দিনে বান্দরবানে চারজন এবং রাঙামাটিতে চারজনের লাশ উদ্ধার।
কক্সবাজারেও ভেসে উঠছে ক্ষতচিহ্ন
কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়ায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
চকরিয়ার বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল ইউএনও জে পি দেওয়ানের সভাপতিত্বে সভা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলমসহ জনপ্রতিনিধিরা। সভায় অতি দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা সচল করাসহ ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ মেরামতের দাবি জানান জনপ্রতিনিধিরা। দুর্গতদের জন্য দুই দফায় ৪৫ মেট্রিক টন চাল এবং চার লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
শিশুসহ সাতজনের লাশ উদ্ধার
জেলার চকরিয়ায় বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়া সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে বাবা ও তাঁর দুই ছেলের মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা হলেন দক্ষিণ বহদ্দারকাটা গ্রামের মৃত মনিরুজ্জামানের ছেলে আনোয়ার হোসেন (৭০) ও তাঁর দুই ছেলে মো. শাহাদাত হোসেন (৫০) ও শহিদুল ইসলাম (২২)। বুধবার রাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর দুই ছেলেকে মৃত ঘোষণা করা হয়। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর গতকাল ভোররাতে বাবারও মৃত্যু হয়।
এদিকে গতকাল ভোরে পেকুয়ায় তিন শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তারা হলো উজানটিয়া ইউনিয়নের ফেরাসিঙ্গাপাড়ার ছাবের আহমদের মেয়ে হুমায়রা বেগম (৮) এবং একই পাড়ার নুরুল আলমের মেয়ে তৌহিদা বেগম (১০) ও ছেলে আমির হোসেন (৫)। তারা সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই-বোন। এ ছাড়া গতকাল চকরিয়ার খুটাখালী ইউনিয়নের পশ্চিমাংশের চিংড়ি জোন এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক বিভীষণ কান্তি দাশ জানিয়েছেন, গতকাল উদ্ধার হওয়া সাতজনের মৃতদেহসহ কয়েক দিনের বৃষ্টি ও ঢলে কক্সবাজারে মৃতের সংখ্যা ২০ জনে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রামে ভাঙা সড়কে যান চলাচলে ভোগান্তি
টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা এবং বন্যায় জেলার সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ উপজেলায় স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুই দিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় জলাবদ্ধতার পাশাপাশি জেলায় বন্যা পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়েছে। বন্দর নগরের সঙ্গে পর্যটন শহর কক্সবাজার এবং পার্বত্য জেলা বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ গতকাল স্বাভাবিক হয়। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-বান্দরবান মহাসড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হলেও বন্যার পানিতে মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় ভেঙে যাওয়ায় স্বাভাবিক যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে বলে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা জানান।
শঙ্খ নদীর তীরবর্তী এলাকা চন্দনাইশের দোহাজারী, ধোপাছড়ি, বৈলতলী, সাতবাড়িয়া, বরমা বরকল ইউনিয়ন এবং সাতকানিয়া উপজেলার খাগরিয়া, নলুয়া, আমিলাইশ, চরতি, কালিয়াইশ পুরানগড়, ধর্মপুর ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় জীবন যাপন করছে। বুধবার থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। উপজেলার বেশির ভাগ সড়ক ভেঙে চুরমার। চন্দনাইশের দোহাজারীতে বুধবার সন্ধ্যায় স্রোতে ভেসে দুজন নিখোঁজ হয়। তারা সম্পর্কে নানা-নাতিন। রাতে নাতি মো. আনাছ (১০) এবং গতকাল ভোরে নানা আবু সৈয়দের (৮৩) লাশ উদ্ধার করা হয়।
বান্দরবানে পুরোদমে চালু হয়নি যানবাহন
টানা ছয় দিন বান্দরবান জেলা শহরসহ বেশির ভাগ এলাকা জলমগ্ন থাকার পর গতকাল ভোর থেকে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। ধীরে ধীরে পানি নামতে নামতে দুপুর নাগাদ পুরোপুরি নেমে যায়। তবে জনজীবনে স্বাভাবিক অবস্থা ফেরেনি। জেলার ২৫২টি আশ্রয়কেন্দ্রে সাড়ে ৯ হাজার মানুষ উঠেছিল। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন বাড়ি ফিরলেও এখনো আট হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে। এর মধ্যেই গতকাল শহরের মধ্যমপাড়ায় শঙ্খ নদের তীরে একটি ঘর হেলে পড়ে।
গতকাল বান্দরবান সদরে দুজন এবং নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় আরো দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
বান্দরবান-কেরানিহাট সড়কের দুটি পয়েন্ট থেকে পানি না নামায় বান্দরবানের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ চালু হয়নি। তবে জরুরি প্রয়োজনে কয়েকজনকে ট্যাক্সি ও মিনি পিকআপ ব্যবহার করে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।
পরিবহন সমিতির সদস্য মো. রফিক জানান, বৃহস্পতিবার সকালে ও বিকেলে শ্যামলী পরিবহনের দুটি বাস বান্দরবান থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। অন্য পরিবহনের কোনো বাস যাতায়াত করেনি।
দুর্গত বান্দরবান পৌর এলাকা ও লামায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট প্রকট। সেনাবাহিনী বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং অন্য কিছু প্রতিষ্ঠান বন্যাদুর্গত এলাকায় বোতলজাত পানি সরবরাহ করে। বিপুলসংখ্যক মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে পানি নিয়েছে।
বন্যা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ৫ আগস্ট রাত থেকে বান্দরবান জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বুধবার লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। অন্য এলাকাগুলো টানা পাঁচ দিন অন্ধকারে।
গতকাল বিকেলে বান্দরবান বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করার জন্য প্রধান সাবস্টেশনে কাজ করছেন।
বান্দরবান বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুম আমীর জানান, দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন চালু করতে কাজ চলছে।
বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে কিছু কিছু এলাকায় কয়েকটি মোবাইল সার্ভিস অপারেটরের নেটওয়ার্ক চালু হয়েছে।
রাঙামাটিতে ধীরে ধীরে পানি নামছে
রাঙামাটি জেলায় ছয় দিনে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। ৫ আগস্ট নানিয়ারচরে স্রোতে ভেসে নিখোঁজ হন এক্ক্যোইয়া চাকমা (৮০)। পরদিন চেঙ্গী নদীতে তাঁর লাশ ভেসে ওঠে। ৭ আগস্ট বরকল উপজেলায় নৌকা ডুবে সুমেন চাকমা (১৯) নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয়। জেলায় গতকাল চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। তাঁরা পানিতে ভেসে নিখোঁজ ছিল। তারা হলো বাঘাইছড়ির মো. মহসিনের ছেলে জুয়েল (৭), কাওলা ত্রিপুরা (৪০), রাহুল বড়ুয়া (১০) ও জুনি চাকমা (৭)।
এদিকে দীঘিনালা-সাজেক সড়ক থেকে পানি নেমে যাওয়ায় যান চলাচল শুরু হয়েছে। এতে আটকে পড়া পর্যটকরা সাজেক থেকে ফিরে গেছেন।
বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, লংগদু ও কাপ্তাইয়ে পানি কমতে শুরু করেছে। তবে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা লোকজন বাড়ি ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়নি। নিম্নাঞ্চলে এখনো পানি আছে।
রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, রাঙামাটি জেলায় ২৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়। এতে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছিল। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে ভালো হচ্ছে।
রাঙামাটি কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, বন্যায় আউশ, আমন, আদা, হলুদসহ প্রায় তিন হাজার ৮৩৪ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা)