আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের প্রতি ছিলেন অসাধারণ স্নেহশীল। তিনি নাতি হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে কাঁধে তুলে নিয়েছেন, সিজদায় গেলে তাঁরা পিঠে চড়ে বসলে সিজদা দীর্ঘ করেছেন।” হাদিসে এসেছে, হাসান ও হুসাইন (রা.) নামাজ চলাকালে পিঠে চড়ে বসতেন। মানুষ তাঁদের সরাতে চাইলে নবী (সা.) বলতেন, ‘তাদের ছেড়ে দাও।”
একবার সালাতে থাকা অবস্থায় শিশুর কান্না শুনে নামাজ সংক্ষিপ্তও করেছেন, যাতে মায়ের কষ্ট না হয়।”
কিন্তু একই সঙ্গে তিনি মসজিদের আদবও শিক্ষা দিয়েছেন। মসজিদকে পরিচ্ছন্ন রাখা, অপ্রয়োজনীয় ও উচ্চৈঃস্বরে কথা না বলা, অন্যের ইবাদতে বিঘ্ন না ঘটানো—এসব ছিল তাঁর সুস্পষ্ট নির্দেশনা। নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের মসজিদকে অবোধ শিশু, পাগল, দুষ্কৃতকারী, বেচাকেনা, ঝগড়া-বিবাদ, হৈচৈ, হদ কায়েম এবং অস্ত্রশস্ত্রের উত্তোলন থেকে হেফাজতে রাখবে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৭৫০) যাতে মসজিদের পবিত্রতা ও আদব বজায় থাকে।
অর্থাৎ শিশুর প্রতি মমতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল ইবাদতের পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ববোধ।
“বয়সভিত্তিক দিকনির্দেশনা (ফিকহি বিশ্লেষণ)”
হানাফি ফিকহের আলেমরা নবীজি (সা.)-এর এই সমন্বয়কে বিবেচনা করে বয়স ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে শিশুদের তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন—
১. অতি অল্পবয়সী শিশু : যারা মসজিদের মর্যাদা বোঝে না, টয়লেট ট্রেইনড নয়, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দৌড়ঝাঁপ করে। যদি প্রবল আশঙ্কা থাকে যে তারা মসজিদ নাপাক করবে বা গুরুতর বিঘ্ন ঘটাবে, তাহলে তাদের আনা বৈধ নয়। শিশুদের মসজিদে আনা নিষিদ্ধের হাদিসটি ফকিহরা এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করেছেন।
২. মধ্যম বয়স (৭-১১ বছর) : এরা আংশিক বোঝাপড়া রাখে। এদের আনা সাধারণত জায়েজ এবং প্রশিক্ষণের অংশ। তবে যদি মারাত্মক বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকে, তাহলে না আনাই উত্তম। অভিভাবকের তদারকি এখানে মুখ্য।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘সাত বছর বয়স হলে শিশুকে নামাজের আদেশ দাও এবং দশ বছর হলে প্রয়োজনে মৃদু প্রহার করতে পারো।’
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৪০৭)”
আরেক বর্ণনায় এসেছে, ‘শিশুরা যখন ডান-বাম বুঝতে শুরু করে, তখন তাদেরকে নামাজের নির্দেশ প্রদান করবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৭)
৩. বালেগের নিকটবর্তী (১২-১৪ বছর) : এদের নিয়মিত মসজিদে আনা জরুরি। কারণ বালেগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সালাত ফরজ হয়। আগে থেকে অভ্যাস না হলে পরে তা কঠিন হয়ে পড়ে।”
তাই অভিভাকদের দায়িত্ব হলো, মোটামুটি বুঝমান শিশুদের মসজিদের আদব সম্পর্কে সতর্ক করা এবং মসজিদে আনা। বর্তমান প্রজন্ম দুনিয়াবি ব্যস্ততা এবং তথ্য-প্রযুক্তির মন্দ ব্যবহারের ফলে ক্রমান্বয়ে দ্বিন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং নীতি-নৈতিকতা ভুলে অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে সুন্দর ও অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে শিশুদের মসজিদে গমন খুবই জরুরি। তাই শিশুদের মসজিদে আনার আগে অবশ্যই মসজিদের আদব সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে। এ ব্যাপারে অন্য মুসল্লিদেরও দায়িত্বশীল ও সংযত আচরণ করতে হবে। কোনো শিশুর অতিরিক্ত দুষ্টামির কারণে নামাজে ব্যাঘাত যাতে না ঘটে, কৌশলে সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।