জাকাত ইসলামের অন্যতম মৌলিক আর্থিক ইবাদত। স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন ও সম্পদশালী মুসলিম নর-নারীর ওপর বছরান্তে জাকাতযোগ্য সম্পদের ৪০ ভাগের এক ভাগ জাকাত আদায় করা ফরজ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত আদায় করো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১১০)
অন্যত্র বলেন, ‘দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্য; যারা জাকাত দেয় না এবং তারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না।
১. সোনা ও রুপা : সোনা ও রুপার অলংকার, মুদ্রাকৃতি, তৈজসপত্র, খেলনা, শোপিস ব্যবহৃত বা অব্যবহৃত—সবই জাকাতযোগ্য সম্পদ। নিজ মালিকানায় এক বছর পূর্ণ হলে এবং সোনা সাড়ে সাত ভরি (প্রায় ৮৮ গ্রাম) এবং রুপা সাড়ে বায়ান্ন ভরি (প্রায় ৬১৩ গ্রাম) বা এর অধিক হলে ৪০ ভাগের এক ভাগ বা শতকরা আড়াই ভাগ জাকাত দিতে হবে। পরিধেয় অলংকারের জাকাতে বিষয়েও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। আমর ইবন শুআইব (রহ.) থেকে পর্যায়ক্রমে তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, একজন নারী তাঁর কন্যাসহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খিদমতে উপস্থিত হন।
২. নগদ অর্থ ও আর্থিক সম্পদ : প্রচলিত মুদ্রা যেমন—টাকা, ডলার, পাউন্ড ইত্যাদি বিনিময়ের জন্যই নির্দিষ্ট এবং সোনা-রুপার পরিবর্তে এসব ব্যবহার করা হয়। কাজেই প্রচলিত মুদ্রারও ৪০ ভাগের এক ভাগ বা শতকরা আড়াই ভাগ জাকাত দিতে হবে। যদি তা সোনা বা রুপার নিসাবের মূল্যের সমান হয়।
৩. ব্যাবসায়িক সম্পদ : বিক্রয়ের জন্য প্রস্তুত পণ্য, পাইকারি বা খুচরা মালপত্র, ব্যবসার জন্য মজুদ কাঁচামাল, মালের স্টক ইত্যাদি হলো ব্যাবসায়িক সম্পদ। ব্যবসায়ের মালামালের জাকাত নিরূপণকালে মালিকানার বছর সমাপ্তির দিনে যে সম্পদ থাকে, তাই সারা বছর ছিল ধরে নিয়ে তার ওপর জাকাত দিতে হবে। বছর শেষে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বা কম্পানির যে স্থিতিপত্র তৈরি করা হয়, এতে সাকল্য দেনা-পাওনা, যেমন—মূলধন সম্পদ, চলতি মূলধন, অর্জিত মুনাফা, ক্যাশে এবং ব্যাংকে রক্ষিত নগদ অর্থ, দোকানে ও গুদামে রক্ষিত মালামাল, কাঁচামাল, প্রক্রিয়ায় অবস্থিত মাল, প্রস্তুতকৃত মাল, ঋণ, দেনা ও পাওনা ইত্যাদি হিসাব আনতে হবে। এসবের মধ্যে থেকে স্থায়ী মূলধনসামগ্রী যেমন— মেশিন, দালান, জমিসহ ব্যাংকঋণ, ক্রেডিটে ক্রয়কৃত মাল এবং অন্যান্য ঋণ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট সম্পদের ওপর জাকাত দিতে হবে। ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত জমি, মেশিন বা অন্যান্য সম্পদেরও জাকাত দিতে হবে। কোনো ব্যক্তির একাধিক ব্যবসা থাকলে এবং তার সঙ্গে সোনা-রুপা, নগদ অর্থ, ব্যাংক ব্যালান্স ইত্যাদি থাকলে এসব সম্পদের হিসাবের যোগফলের ভিত্তিতে জাকাত নিরূপণ করতে হবে। ব্যাবসায়িক সম্পদে জাকাত বিষয়ে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সামুরা ইবন জুনদুব (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে খরিদকৃত পণ্যের জাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৬২)
পরিশেষে বলা যায়, জাকাত ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক ও কার্যকর বিধান। সোনা-রুপা, নগদ অর্থ ও ব্যাবসায়িক সম্পদসহ বিভিন্ন জাকাতযোগ্য সম্পদের সঠিক হিসাব নিরূপণ করলে জাকাত যথাযথভাবে আদায় করা সম্ভব হয়। এর ফলে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত হয়।