বাসিত চৌধুরী বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
বন্দরনগরীর খুলশী, নাসিরাবাদ ও পাঁচলাইশের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটগুলোর ড্রয়িংরুম এখন আর কেবল আড্ডার জায়গা নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা হয়ে উঠেছে এক একটি ভয়ংকর ‘সেফ হাউস’। যেখানে ‘যৌনতা’ কেবল পণ্য নয়, বরং বিত্তবানদের নিঃস্ব করার সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র। সুন্দরী তরুণীদের ব্যবহার করে পাতা ‘হানি ট্র্যাপ’ বা রূপের মরণফাঁদে পা দিয়ে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা হারাচ্ছেন ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।
ঘটনার পুনরাবৃত্তি ও সন্দেহের অবকাশ
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক মাসে চট্টগ্রামে এই ধরনের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ঘটনা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) এবং স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর গত ৩০ দিনের ক্রাইম রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একই কায়দায় অন্তত ডজনখানেক বিত্তবান ব্যক্তি সর্বস্ব খুইয়েছেন। ঘটনার এই ভয়াবহ পুনরাবৃত্তি এবং প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই রকম ‘মোডাস অপারেন্ডি’ বা অপরাধের ধরন দেখে এটি যে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের কাজ, তা নিয়ে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না। মূলত খুলশী ও পাঁচলাইশ এলাকায় একের পর এক ফ্ল্যাট জিম্মি করার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই এই বিশেষ অনুসন্ধান শুরু হয়।
যেভাবে ছড়ানো হয় মরণফাঁদ
এই সিন্ডিকেটটি মূলত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ডেটিং অ্যাপে ভুয়া কিন্তু আকর্ষণীয় প্রোফাইল ব্যবহার করে টার্গেট করা হয় বিত্তবানদের। প্রথমে সাধারণ বন্ধুত্ব, তারপর প্রলুব্ধকর চ্যাটিং এবং সবশেষে নির্জন ফ্ল্যাটে ‘একান্ত সময়’ কাটানোর আমন্ত্রণ। টার্গেট করা ব্যক্তি সেই ফ্ল্যাটে পা রাখা মানেই এক অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনে অপরাধ চক্রের সাথে জড়িত হিসেবে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তারা বর্তমানে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে এখানে ব্যবহৃত নামগুলো ছদ্মনাম হিসেবে গণ্য হতে পারে অথবা এগুলো সুনির্দিষ্ট তদন্তাধীন তথ্যের ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়েছে।)
অনুসন্ধানে উঠে আসা সিন্ডিকেটের মূল হোতা ও সদস্যদের তালিকা:
১. মাস্টারমাইন্ড—সাইফুল ওরফে ডন সাইফুল (৪২): চক্রের মূল নিয়ন্ত্রক। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা সাইফুল মূলত ফ্ল্যাট ভাড়া করা এবং আইনি ঝামেলা সামলানোর কাজ করেন।
২. হানি ট্র্যাপ স্পেশালিস্ট—রিয়া (২৪): নিজেকে উঠতি মডেল পরিচয় দিয়ে বিত্তবানদের প্রলুব্ধ করাই তার কাজ। তার হাতেই প্রথম ফাঁদে পা দেন ভুক্তভোগীরা।
৩. টেকনিক্যাল এক্সপার্ট—আরমান হোসেন (২৮): গোপন ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ ও ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাস্টারমাইন্ড।
৪. ভুয়া ‘সাংবাদিক’—জসিম উদ্দিন (৩৫): স্পটে ‘ক্রাইম রিপোর্টার’ সেজে হাজির হওয়া এবং সমঝোতার নাম করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া তার দায়িত্ব।
৫. ক্যাডার—কালা সুমন (২৬): অস্ত্র বা শক্তির ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে জিম্মি করে রাখা এই সদস্যের কাজ।
টাকার অঙ্ক: যৌনতা যখন কোটি টাকার বাণিজ্য
এই কারবারে অর্থের লেনদেন সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। প্রতিবেদকের হাতে আসা তথ্যমতে:
প্রাথমিক ডিমান্ড: ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা।
ব্ল্যাকমেইলিংয়ের রেট: ১০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত।
বার্ষিক বাণিজ্য: গত এক বছরে এই সিন্ডিকেটগুলো আনুমানিক ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
আইনের ফাঁক ও নীরবতা
এই সিন্ডিকেটের টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি হলো ‘সামাজিক সম্মান’। ভুক্তভোগীরা প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি হওয়ায় পুলিশের কাছে যেতে ভয় পান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, “এটি একটি আধুনিক দস্যুতা। ভুক্তভোগীদের নীরবতাই অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।”
প্রশাসনের বক্তব্য
সিএমপি (CMP)-র সাইবার ক্রাইম ইউনিটের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গত এক মাসে পাওয়া ডজনখানেক অভিযোগের পুনরাবৃত্তি দেখে তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে এটি একটি বড় চক্র। বর্তমানে কিছু সুনির্দিষ্ট ফ্ল্যাটকে কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রামের বুকে গড়ে ওঠা এই ‘হানি ট্র্যাপ’ সিন্ডিকেট কেবল সম্পদ লুট করছে না, বরং অনেক সাজানো সংসার ধ্বংস করে দিচ্ছে। এই রূপের মরণফাঁদ রুখতে ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের বিকল্প নেই।