বাসিত চৌধুরী বিশেষ প্রতিবেদন
শিক্ষা ও গবেষণার প্রসারের পরিবর্তে উপাচার্যের ব্যক্তিগত শৌখিনতা, বৃক্ষ নিধন এবং শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করার অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি) ক্যাম্পাস। বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. রেজাউল করিমের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং তার নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসের চায়ের আড্ডা—সবখানেই এখন উপাচার্যের ‘বাংলো কেন্দ্রিক’ নীতি নিয়ে চলছে বিদ্রূপ ও সমালোচনা।
ট্যুর বন্ধ ও শিক্ষা স্বার্থের সংঘাত
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ক্যাম্পাসের নিয়মিত ‘ফিল্ড ওয়ার্ক’ বা শিক্ষা সফর বন্ধ করে দেওয়া। একটি ছোট দুর্ঘটনার অজুহাতে দীর্ঘদিনের প্রচলিত এসব ট্যুর বাতিল করায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, অনেক মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ট্যুরগুলোই দেশের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণের একমাত্র সুযোগ ছিল। বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের এই পথ বন্ধ করে উপাচার্য শিক্ষার্থীদের বাংলোতে ‘চা খাওয়ার’ দাওয়াত দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, “বাস্তব অভিজ্ঞতা উপাচার্যের বাংলোতে চা খেয়ে সম্ভব নয়।” এমনকি শিক্ষার্থীরা তাদের ‘উন্নয়ন ফি’ দেওয়া বন্ধ করার মতো কঠোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।
বৃক্ষ নিধন বনাম কোটি গাছ রোপণের ‘বিভ্রান্তি’
ক্যাম্পাসের মেইন গেটের সৌন্দর্যবর্ধনের দোহাই দিয়ে মেহগনিসহ কয়েকশ মূল্যবান গাছ কাটার ঘটনায় সরব হয়েছেন পরিবেশবাদী শিক্ষার্থীরা। তারা একে ‘গাছ কাটা উৎসব’ বলে অভিহিত করছেন। অন্যদিকে, উপাচার্যের অনুসারীদের দাবি—তিনি কোটি কোটি গাছ লাগাচ্ছেন। উপাচার্য নিজে বিভিন্ন বক্তৃতায় কয়েক কোটি গাদা, ডালিয়া ও গোলাপ গাছ লাগানোর পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছেন। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাডেমিক গবেষণার চেয়ে সাজসজ্জার পেছনে এত বিপুল ব্যয় ও পরিকল্পনা কি আদৌ যৌক্তিক? এমনকি তার বিশাল চারা রোপণের দাবিকে ‘কাল্পনিক পরিসংখ্যান’ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
বাংলো-কেন্দ্রিক প্রশাসন ও ‘মৎস্য উৎসব’
উপাচার্য তার সরকারি বাংলোটিকে দর্শনীয় স্থানে রূপ দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হলের খাবার তালিকায় মূলা পাঠানো, ক্যাম্পাসের পুকুরে মাছ ধরে ‘মৎস্য উৎসব’ করা এবং শিক্ষার্থীদের বাংলোতে মূলা চাষের গল্প শোনানোকে শিক্ষার্থীরা ‘প্রশাসনিক অযোগ্যতা’ হিসেবে দেখছেন। অনেকে বিদ্রূপ করে বলছেন, উপাচার্য হয়তো বাংলোকেই রাঙামাটি বা কক্সবাজারের বিকল্প বানাতে চাইছেন যাতে শিক্ষার্থীদের আর কোথাও যেতে না হয়।
সমন্বয়ক নির্ভরতা ও রাজনৈতিক গুঞ্জন
শিক্ষার্থীদের একটি অংশের দাবি, উপাচার্য তার পদ টিকিয়ে রাখতে ছাত্র আন্দোলনের তথাকথিত ‘সমন্বয়কদের’ বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন এবং তাদের ওপর ভর করে প্রশাসন চালাচ্ছেন। এমনকি তার নিয়োগকর্তা হিসেবে জনৈক ‘মিনহাজুল আবেদিন সম্পদ’-এর নাম বারংবার তার বক্তৃতায় আসা নিয়েও রহস্য দানা বেঁধেছে। অ্যাকাডেমিক অভিভাবকের পরিবর্তে উপাচার্যের এমন ‘রাজনৈতিক’ ও ‘তোষামোদি’ আচরণে ক্ষুব্ধ সচেতন শিক্ষার্থীরা।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেখানে গবেষণার মান বাড়ানোর কথা, সেখানে গাছ কাটা, মাছ ধরা আর বাংলোর বাগান নিয়ে উপাচার্যের অতি-উৎসাহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের হতাশ করেছে। এই অসন্তোষ দ্রুত নিরসন না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি—ব্যক্তিগত বিলাসিতা বাদ দিয়ে উপাচার্য যেন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফরের অধিকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার দিকে নজর দেন।