বড়াইবাড়ী দিবস। ২০০১ সালের এই ভোরে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বড়াইবাড়ী সীমান্তে লেখা হয়েছিল বাংলাদেশের সাহস আর আত্মত্যাগের এক রক্তাক্ত দলিল। যেদিন ভারতীয় বিএসএফের বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা।
ভোর ৪টা, এক কৃষকের চিৎকারে জেগে ওঠে সীমান্ত
২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল। ভোর আনুমানিক ৪টা। বড়াইবাড়ী গ্রামের কৃষক মিনহাজ উদ্দিন বোরো ধানক্ষেতে পানি দিতে যান। কুয়াশা ভেদ করে দেখেন শত শত সশস্ত্র বিএসএফ সদস্য বাংলাদেশের মাটিতে। ভারতীয় কমান্ডো, সেনা ও বিএসএফের প্রায় ৪০০ সদস্য কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে ঢুকে পড়েছে। তারা মিনহাজ উদ্দিনের কাছে বিডিআর ক্যাম্পের অবস্থান জানতে চায়।
মিনহাজ উদ্দিন কৌশলে ভুল পথ দেখিয়ে দৌড়ে যান বিডিআর ক্যাম্পে। তার সেই দৌড়, সেই খবর না পৌঁছালে ইতিহাস হয়তো অন্যরকম হতো।
বুলেটের জবাব বুলেটে
খবর পেয়েই প্রস্তুত হয় বিডিআর। পাশের ইজলামারী ও খেওয়ারচর ক্যাম্পে সতর্কবার্তা যায়। ভোর সাড়ে ৪টা। বিএসএফ পূর্ব ও দক্ষিণ দিক থেকে বিডিআর ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে।
প্রথম গুলিতেই লুটিয়ে পড়েন ল্যান্স নায়েক ওয়াহিদুজ্জামান। মাটিতে মিশে যায় তার রক্ত। কিন্তু থামেনি বিডিআর।
সকাল ১০টায় জামালপুর ৩৩ রাইফেলসের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল জামানের নেতৃত্বে আরও বিডিআর সদস্য পৌঁছালে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে পুরো সীমান্তে। টানা দুই দিন চলে সেই রক্তক্ষয়ী লড়াই।
সেই যুদ্ধে শহীদ হন সিপাহী আব্দুল কাদের ও সিপাহী মাহফুজুর রহমান। আহত হন হাবিলদার আব্দুল গণি, সিপাহী জাহিদুর রহমান, নজরুল ইসলাম, দুলাল বড়িয়া, আওলাদ হোসেন, নুরুল ইসলাম, আব্দুর রহমানসহ অন্তত ১২ জন।
পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ফিরে যায় বিএসএফ
এই যুদ্ধে বিএসএফের ১৬ জন সদস্য নিহত হয়। স্থানীয়দের দাবি, সংখ্যাটা আরও বেশি। জীবিত আটক হয় দুই বিএসএফ সদস্য, বিমল প্রসাদ ও অক্ষয় কুমার। যুদ্ধের মাঠে ফেলে যায় তারা এলএমজি, এসএলআর, হ্যান্ড গ্রেনেড, ম্যাগাজিন, ওয়্যারলেস সেটসহ বিপুল অস্ত্র।
পরে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে নিহত বিএসএফ সদস্যদের মরদেহ ফেরত দেওয়া হয়।
যুদ্ধের পেছনের গল্প
১৯৭১ সালে সিলেটের পাদুয়া এলাকায় ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। স্বাধীনতার পর বিএসএফ সেই এলাকা দখল করে নেয়। ১৯৯৯ সালে বৈঠকে ক্যাম্প ছাড়তে বললেও তারা ছাড়েনি। ২০০১ সালের ১৫ এপ্রিল বিডিআর পাদুয়া পুনর্দখল করে তিনটি ক্যাম্প বসায়। তারই প্রতিশোধ নিতে ১৮ এপ্রিল বড়াইবাড়ীতে হামলা চালায় বিএসএফ।
আতঙ্কে পালিয়েছিল ৪০ হাজার মানুষ
সেদিন শুধু সীমান্তরক্ষীরা নয়, রক্ত ঝরেছিল সাধারণ মানুষেরও। মকবুল হোসেন, গোলাম মোস্তফা, শেখ সাদী, বিলকিস বেগম, ছমিরন বেগমসহ প্রায় ২০ জন গ্রামবাসী আহত হন।
বড়াইবাড়ীসহ সীমান্তের অন্তত ২৫টি গ্রামের ৪০ হাজার মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ঘর ছেড়ে পালায়। ফসলের মাঠ, গরু-ছাগল, ঘরদোর সব ফেলে শুধু জীবন হাতে নিয়ে ছুটেছিল তারা।
২৫ বছর পরও তাজা সেই স্মৃতি
স্থানীয় বাসিন্দা হাসান আলী আজও ভুলতে পারেন না সেই সকাল, “বিএসএফ হঠাৎ ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালায়। আমরা বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হই।”
স্কুল শিক্ষক আব্দুর রহমান বলেন, “বড়াইবাড়ী যুদ্ধের পর দীর্ঘদিন আতঙ্কে ছিলাম। সামান্য শব্দেও গুলির ভয় পেতাম। তবে এই যুদ্ধ আমাদের গর্ব। ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিজয়।”
বড়াইবাড়ীর মাটি আজও কথা বলে। বলে তিন শহীদের আত্মত্যাগের কথা। বলে এক কৃষকের সাহসের কথা। বলে, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এই জাতি কখনো মাথা নত করে না।
১৮ এপ্রিল তাই শুধু একটি তারিখ নয়। এটি বাংলাদেশের সীমান্তে লেখা বীরত্বের এক অমর কাব্য।