এস এম জামান, এটিভি সংবাদ //
বর্তমান যুগে সোশ্যাল মিডিয়া কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি এখন বাণিজ্যের অন্যতম শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের হাত ধরে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে বিশাল এক ই-কমার্স ইকোসিস্টেম। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ যেমন থাকে, তেমনি ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের এই জোয়ারের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভয়াবহ প্রতারণার ঘটনা।
সাধারণ গ্রাহকদের সরলতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু চক্র চালাচ্ছে ডিজিটাল জালিয়াতি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় প্রতারক চক্রগুলো নিয়মিত তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। চটকদার বিজ্ঞাপন নামীদামি ব্র্যান্ডের পণ্য পানির দরে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বিজ্ঞাপনে যে ছবি দেখানো হয়, ডেলিভারি পাওয়ার পর তার সাথে বাস্তবের পণ্যের আকাশ-পাতাল তফাৎ থাকে।
অর্ডার কনফার্ম করার নামে অগ্রিম বিকাশ বা নগদ পেমেন্ট নিয়ে নেওয়া হয়। টাকা পাওয়ার পর পেজটি ব্লক করে দেওয়া হয় বা আর কোনো যোগাযোগ করা হয় না। আকর্ষণীয় অফারের লিংকে ক্লিক করতে বলে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য বা ব্যাংক ডিটেইলস চুরি করে নেওয়া হয়।
পেইড রিভিউ বা ফেক আইডি দিয়ে কমেন্ট বক্স ভরিয়ে রাখা হয়, যাতে ক্রেতা বিশ্বাস করে যে এটি একটি বিশ্বস্ত পেজ। নিম্নমানের বা ভেজাল পণ্যকে ‘অরিজিনাল’ বা ‘ইমপোর্টেড’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া।
বাংলাদেশে একটি ফেসবুক পেজ খুলে ব্যবসা শুরু করা অত্যন্ত সহজ। এর জন্য কোনো ট্রেড লাইসেন্স বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বালাই নেই, যা অপরাধীদের কাজকে সহজ করে দিচ্ছে।
অনেকে সামান্য টাকার প্রতারণার শিকার হলে মামলা বা অভিযোগ করতে চান না, যা প্রতারকদের আরও উৎসাহিত করে। ক্রেতারা বাজারের স্বাভাবিক মূল্যের চেয়ে অস্বাভাবিক কম দামে পণ্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেন, যা তাদের সহজেই ফাঁদে ফেলে।
প্রতারণা রোধে গ্রাহক ও প্রশাসন উভয়কেই দায়িত্বশীল হতে হবে। অপরিচিত বা নতুন পেজ থেকে পণ্য কেনার আগে তাদের পুরনো পোস্ট, রিভিউ এবং যোগাযোগের ঠিকানা যাচাই করুন। ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ বা পণ্য দেখে মূল্য পরিশোধ করার অপশন রাখা সবচেয়ে নিরাপদ।
সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের উচিত অনলাইন ব্যবসার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা। বিশেষ করে এফ-কমার্স (Facebook Commerce)-এর ক্ষেত্রে ট্র্যাকিং নিশ্চিত করা খুব জরুরি।
প্রতারিত হলে চুপ না থেকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা নিকটস্থ থানায় (সাইবার ক্রাইম ইউনিট) দ্রুত অভিযোগ জানাতে হবে। সরাসরি ব্যক্তিগত নম্বরে টাকা না পাঠিয়ে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব সুরক্ষিত পেমেন্ট গেটওয়ে বা এসক্রো (Escrow) সার্ভিস ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক অনলাইন মার্কেটিং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণসঞ্চার করেছে। এটি অসংখ্য তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করেছে। কিন্তু কিছু অসাধু চক্রের কারণে পুরোখাতের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কেনাকাটার ক্ষেত্রে সচেতনতা এবং সরকারি কঠোর নজরদারিই পারে এই ভয়াবহ প্রতারণার জাল ছিন্ন করতে। মনে রাখতে হবে, “অস্বাভাবিক সস্তাই প্রতারণার প্রথম লক্ষণ।”