আনোয়ার হোসেন, নিজস্ব প্রতিবেদক//
সবুজ দিগন্ত আর অবারিত নীল আকাশের নিচে বিলের থইথই জলের সাথে শাপলা ফুলের এক চিরায়ত প্রেমের গল্প রচিত হয়। বর্ষা ও শরতে বাংলার খাল-বিল আর জলাশয়গুলোতে বিনা যত্নেই ফুটে ওঠে সাদা, লাল আর নীল রঙের অসংখ্য শাপলা, যা দেখে মনে হয় প্রকৃতি নিজ হাতে নীল জলের বুকে লাল-সাদা ফুলের আল্পনা এঁকে দিয়েছে।
প্রকৃতির অকৃত্রিম সন্তান এই জলজ ফুল। বর্ষার শুরুতে বিলের ঘোলা জলের গভীর থেকে আস্তে আস্তে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে শাপলা। এর ডাঁটা বা ডাটি মাটির গভীরে প্রোথিত থাকে, আর পাতাগুলো ভেসে বেড়ায় পানির ওপর। ভোরের মিষ্টি আলো ফোটার সাথে সাথেই পাপড়ি মেলে দেয় শাপলা। জলের এই কোমল ও শান্ত আশ্রয়ে ফুটে থাকা শাপলার প্রতিটি পাপড়ি যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত চিত্রকর্ম।
বাংলার লোকজ সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের সাথে শাপলা ফুলের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। নিছক সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবেই নয়, বিলের এই ফুলটি গ্রামীণ জনপদের মানুষের জীবন-জীবিকারও এক বড় উৎস। স্থানীয় বাসিন্দারা, বিশেষ করে নারীরা বিল থেকে শাপলা তুলে স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করে নিজেদের সংসার চালান। এছাড়া, সুস্বাদু সবজি ও পুষ্টিকর খাবার হিসেবেও এর কদর এখন শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সমানভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশে মূলত সাদা, লাল ও নীল এই তিন রঙের শাপলা দেখা গেলেও, এদের মধ্যে ‘সাদা শাপলা’ আমাদের জাতীয় ফুলের মর্যাদায় ভূষিত। সাদা শাপলা পবিত্রতা, শান্তি এবং বাংলাদেশের মানুষের অটুট ঐক্যের প্রতীক। দেশের মুদ্রা, ডাকটিকিট, এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নথিতে এমনকি ঢাকার কেন্দ্রস্থল মতিঝিল এলাকায় শাপলা ফুলের ভাস্কর্য আমাদের এই জাতীয় ঐতিহ্যকে সারা বিশ্বের সামনে তুলে ধরে।
গ্রামবাংলার বিস্তীর্ণ জলাশয়ে লাল বা সাদা শাপলার এমন সমারোহ এখন দারুণ দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কিছু কিছু বিলে হাজার হাজার লাল শাপলার রঙিন উৎসব দেখতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় জমে। বিলের শান্ত জলের সাথে শাপলার এই মায়াবী সখ্যতা ও ভালোবাসা যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে মুক্তি দিয়ে এক অনন্য প্রশান্তি এনে দেয়।