এস এম জামান | এটিভি সংবাদ //
সম্প্রতি জনপরিসরে একটি বিতর্ক বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে—বাঙালি জাতি কি অকৃতজ্ঞ? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে আড্ডার টেবিলে প্রায়ই শোনা যাচ্ছে, “জাতি আজ অকৃতজ্ঞ”। সমাজের একশ্রেণির মানুষের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড এবং আদর্শহীনতাকে কেন্দ্র করে এমন একটি গুরুতর তকমা জুড়ে দেওয়া হচ্ছে একটি গোটা জাতির গায়ে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিষয়টি যতটা না জাতীয় চরিত্রের সাথে সম্পর্কিত, তার চেয়ে বেশি বর্তমান সময়ের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন।
অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে যারা দেশের জন্য বা সমাজের জন্য বিশাল ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সময়ের আবর্তে তাঁদের অবদানকে আজ অনেকেই ভুলে যাচ্ছেন। স্বার্থপরতা এবং আত্মকেন্দ্রিকতা মানুষকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে কৃতজ্ঞতাবোধ গৌণ হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অকৃতজ্ঞতার এই ধারণাটি মূলত: কিছু বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা অবদানকে আড়াল করা হচ্ছে। ইন্টারনেটের যুগে তথ্যের অতিপ্রবাহে মানুষ খুব দ্রুত কোনো বিষয়কে গ্রহণ করছে এবং আবার মুহূর্তেই ভুলে যাচ্ছে। পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় মানবিক গুণাবলির চেয়ে বস্তুগত অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা সংবেদনশীলতাকে কমিয়ে দিচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানী ড. মনিরুজ্জামান মনে করেন, “একটি জাতি বা জনগোষ্ঠীকে ঢালাওভাবে ‘অকৃতজ্ঞ’ বলাটা বৈজ্ঞানিক নয়। মানুষ যখন অনিশ্চয়তায় ভোগে বা প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে অস্তিত্ব রক্ষায় লড়াই করে, তখন তার মধ্যে ‘কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশের মানসিকতা কমে যায়। এটি জাতির চরিত্র নয়, বরং পারিপার্শ্বিক চাপের বহিঃপ্রকাশ।”
ইতিবাচক দিক কি তবে ঢাকা পড়ছে? বিপরীত দিকে অনেক সমাজ পর্যবেক্ষক মনে করেন, বাঙালির এই ‘অকৃতজ্ঞ’ আখ্যা দেওয়ার প্রবণতাটি আসলে হতাশাজনক। তারা স্মরণ করিয়ে দেন যে, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে কিংবা জাতীয় সংকটে এই বাঙালি জাতিই আবার সর্বোচ্চ একতা ও কৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।
আর্তমানবতার সেবা, স্বেচ্ছাসেবী কাজ এবং ইতিহাসের সঠিক মূল্যায়নে সাধারণ মানুষের অদম্য আগ্রহ প্রমাণ করে যে, নৈতিক ভিত্তিটি এখনো ভেঙে পড়েনি।