অনুসন্ধানী প্রতিবেদক। এটিভি সংবাদ //
“অল্প সময়ে গ্যারান্টিসহ পাইলস নির্মূল”, “কোনো অপারেশন ছাড়াই অর্শ-গেজ থেকে চিরমুক্তি”, কিংবা “ভেষজ ওষুধের জাদুকরী ছোঁয়ায় ফিস্টুলার স্থায়ী সমাধান”—সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজফিড স্ক্রল করলেই এমন শত শত চটকদার ও লোভনীয় বিজ্ঞাপন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আর এই ধরনের বিভ্রান্তিমূলক চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ প্রতারণার জাল। এই চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে সম্প্রতি সামনে এসেছে রাজধানীর উত্তরখান থানাধীন ফায়দাবাদ চুয়ারীটেক “রাব্বানী দাওয়া সেন্টার” নামের একটি ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়ম-নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, সাধারণ মানুষের সরলতা এবং লোকলজ্জার সুযোগ নিয়ে এই সেন্টারটি কীভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এবং রোগীদের ঠেলে দিচ্ছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে, তা নিয়েই আজকের এই অনুসন্ধান।
যেভাবে আকৃষ্ট করা হয় সাধারণ মানুষকে পাইলস, ফিস্টুলা বা মলদ্বারের রোগগুলো নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের সামাজিক ট্যাবু বা লোকলজ্জা কাজ করে। সাধারণ মানুষ শুরুতে এগুলো নিয়ে মূলধারার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে যেতে দ্বিধাবোধ করেন। “রাব্বানী দাওয়া সেন্টার” এর কর্ণধার খলিলুর রহমান রব্বানী ঠিক এই দুর্বলতাকেই পুঁজি করেছে।
ফেসবুক ও ইউটিউবে পেশাদার ভিডিও এডিটিংয়ের মাধ্যমে তারা এমন সব ভিডিও প্রচার করে, যেখানে দাবি করা হয়—কোনো রকম অস্ত্রোপচার বা ইনজেকশন ছাড়াই তাদের বিশেষ “গোপন ভেষজ ওষুধে” রোগ পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়। তাদের বিজ্ঞাপনে প্রায়ই কিছু মানুষকে “সাবেক রোগী” সাজিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করানো হয়, যারা স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী অবলীলায় বলে যান যে তারা এই সেন্টারের ওষুধ খেয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানের নামের সাথে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য যোগ করে এবং বিজ্ঞাপনে ধর্মীয় বুলি “আল্লাহর কসম” ব্যবহার করে সাধারণ ও বিশ্বাসপ্রবণ মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করা হয়।
রাব্বানী দাওয়া সেন্টারের ভেতরের ভয়াবহ প্রতারণার রূপরেখা
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই দাওয়া সেন্টারের তথাকথিত চিকিৎসকদের কোনো বৈধ মেডিকেল ডিগ্রি MBBS, BDS বা স্বীকৃত ইউনানি/আয়ুর্বেদিক ডিগ্রি নেই। সাধারণ কিছু গাছগাছড়া এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ব্যথানাশক (Steroid) ট্যাবলেট গুঁড়ো করে তারা নিজস্ব সিলমারা কৌটায় ভরে দেয়। ২৫ টাকার ভুয়া ওষুধের দাম রাখা হয় ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরা যখন তাদের ফাঁদে পা দিয়ে যোগাযোগ করেন, তখন অগ্রিম টাকা নিয়ে বা কন্ডিশনে কুরিয়ারের মাধ্যমে ওষুধ পাঠানো হয়। ওষুধ কাজ না করলে বা রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হলে, পরবর্তীতে সেই রোগীকে ব্লক করে দেওয়া হয় অথবা হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা ঔষধ প্রশাসনের কোনো ধরনের বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এই কেন্দ্রটি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থায়ী সমাধানের নামে স্থায়ী পঙ্গুত্ব!
পাইলস বা ফিস্টুলার মতো সংবেদনশীল রোগে ভুল বা অপচিকিৎসার ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। ভুক্তভোগী রোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাব্বানী দাওয়া সেন্টারের ওষুধ ব্যবহারের পর অনেকের সমস্যা কমার বদলে বহুগুণ বেড়ে গেছে যে তথ্য আমাদের হাতে রয়েছে।
মলদ্বারের রোগে যত্রতত্র ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা এসিড জাতীয় উপাদান ব্যবহার করলে ওই অংশের টিস্যু চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে (Necrosis)। এর ফলে পরবর্তীতে মল ধরে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা, তীব্র সংক্রমণ (Sepsis), এমনকি মলদ্বারের ক্যানসারের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়। তখন বড় ধরনের অপারেশন করেও রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগীদের আকুতি
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী জানান, “ফেসবুকে রাব্বানী দাওয়া সেন্টারের বিজ্ঞাপন দেখে ভাবছিলাম ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ঘরে বসেই ভালো হবো। ১৫ হাজার টাকার ওষুধ খাওয়ার পর আমার মলদ্বারে তীব্র ইনফেকশন হয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে সরকারি হাসপাতালে গিয়ে অপারেশন করাতে হয়েছে। টাকা তো গেলই, জীবনটাও শেষ হতে বসেছিল। আমি এই প্রতারকদের বিচার চাই।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে এমন লাগামহীন প্রতারণা এখনই বন্ধ করা জরুরি।
দ্রুত এই ভুঁইফোড় “রাব্বানী দাওয়া সেন্টার” এর মূল হোতা মুফতি খলিলুর রহমান রব্বানী, প্রতারক সিন্ডিকেটসহ অবৈধ কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হোক। এর বাইরেও যারা অনলাইনে এ ধরনের প্রতারণা করছে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন, এদেশের সচেতন মহল।
সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে যে, পাইলস বা ফিস্টুলা কোনো সাধারণ চর্মরোগ নয় যে বিজ্ঞাপনের মলম লাগালেই সেরে যাবে। এর জন্য অবশ্যই রেজিস্টার্ড কোলোরেক্টাল সার্জন (Colorectal Surgeon) দেখাতে হবে।