অনুসন্ধানী প্রতিবেদক। এটিভি সংবাদ //
একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ বর্তমান ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মটি অনেক সময় অপপ্রচারের মাধ্যম হিসেবেও ভয়াবহ আকারে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুক, টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে স্বাস্থ্যবৃদ্ধির ওষুধ বা ‘হেলথ সাপ্লিমেন্ট’ নামে বিভিন্ন অনিবন্ধিত ও ক্ষতিকর ওষুধের বিজ্ঞাপন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব অসাধু ব্যবসার প্রসারে নারীদের মুখপাত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফেসবুকে একাধিক নামে এ ধরনের ভুয়া অনিবন্ধিত ওষুধ বিক্রি করছে। একাধিক নামের মধ্যে বিশেষ করে রয়েছে “Natural By Gain” (ন্যাচারাল বাই গেইন)। যারা লেবেলছাড়া ভুয়া ওষুধের কৌটা নিয়ে প্রচারণা করছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবশালী বা সাধারণ ব্যবহারকারী নারীদের মডেল হিসেবে ব্যবহার করে এসব নাম ও লেবেলছাড়া ভুয়া ওষুধের কোটা হাতে ধরিয়ে প্রচার করা হয়। এর পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশলগত বিষয় কাজ করে।
একজন নারী যখন নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলে কোনো ওষুধের গুণগান করেন, তখন সাধারণ ক্রেতারা (বিশেষ করে অন্যান্য নারীরা) সেটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন। এটি মূলত: এক ধরনের ‘ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং’ বা পরিচিত মুখ ব্যবহার করে ভোক্তার আস্থা অর্জনের কৌশল।
অনেক ক্ষেত্রে অতি-চিকন বা অতি-মোটা হওয়ার সমস্যাকে পুঁজি করে নারীদের মানসিকভাবে দুর্বল করা হয়। দ্রুত ওজন কমানো বা বাড়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে এসব ভুয়া ওষুধের চাহিদা তৈরি করা হয়।
সরাসরি লাইভ সেশনে এসে যখন কোনো নারী ওই ওষুধগুলো ব্যবহার করে ‘চমৎকার ফলাফল’ পাওয়ার দাবি করেন, তখন তা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করে। এই বাণিজ্যের ভয়াবহ দিক এই ধরনের লেবেলছাড়া ভুয়া ওষুধ বাজারজাতকরণ জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে
এসব ওষুধের বেশিরভাগই মানহীন এবং ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা কেমিক্যাল মিশ্রিত থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এগুলো কিডনি, লিভার এবং হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।
কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেয়ে বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার হয়ে ব্যবহারকারীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। উচ্চমূল্যে নিম্নমানের বা ক্ষতিকর পণ্য কিনে মানুষ আর্থিকভাবে প্রতারিত হচ্ছে।
যেহেতু এসব ওষুধ বেশিরভাগই অবৈধ ও অনিবন্ধিত, তাই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে বা প্রতারণার শিকার হলে আইনি প্রতিকার পাওয়াটাও বড় কঠিন হয়ে পড়ে।
অনেকে অবচেতনভাবেই এর সাথে জড়িয়ে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন বা সহজ উপায়ে অর্থ উপার্জনের নেশা নারীদের এই অসাধু ব্যবসার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক সময় তারা নিজেরাও বুঝতে পারেন না যে, তারা অন্যের স্বাস্থ্যহানির কারণ হচ্ছেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে তারা পরিকল্পিতভাবে কমিশন বা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এই প্রতারণায় অংশ নেন।
সামাজিক সচেতনতা এবং কঠোর আইনি পদক্ষেপ ছাড়া এই প্রবণতা রোধ করা সম্ভব নয়। কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট কেনার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং পণ্যের নিবন্ধন যাচাই-বাছাই করা উচিত।
ফেসবুক বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর ও ক্ষতিকর বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে ‘রিপোর্ট’ অপশন ব্যবহার করে কর্তৃপক্ষকে জানানো। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে এসব পেজ ও তাদের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন পণ্যের প্রচার করেন, তাদের পণ্যের গুণমান এবং বৈধতা যাচাই করার দায়বদ্ধতা থাকতে হবে।
স্বাস্থ্য হলো মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ। শুধুমাত্র সুন্দর শারীরিক গঠনের নেশায় বা চটকদার বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে পড়ে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সোশ্যাল মিডিয়াকে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত, প্রতারণার ফাঁদ হিসেবে নয়। নারীদের সচেতনতাই পারে এই অসাধু চক্রের হাত থেকে সমাজকে রক্ষা করতে।