টাঙ্গাইলের মধুপুর পৌরসভার বিভিন্ন অফিস এবং বাসাবাড়িতে আফ্রিকান জায়ান্ট শামুকের অবাধ বিচরণের কারণে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। মধুপুর পৌর সভার পূর্ব পাশের জানালার গ্রিল দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় আছে এই বিরল প্রগতির প্রাণী। অএ পৌর সভার টিকাদান কর্মী নাছরিন আক্তার বলেন, আমার বাসার চতুর সাইট ঘরের বেড়া জানালা ও গাছের সাইট দিয়ে অগনিত এই শামুক সর্বত্র দেখা যাচ্ছে। আমরা এক প্রকার আতঙ্কের মধ্যে আছি।
(Giant African Snail বা Lissachatina fulica) হলো বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও ক্ষতিকর স্থলজ শামুক। পূর্ব আফ্রিকার স্থানীয় এই শামুকটি অত্যন্ত দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে এবং ৫০০-রও বেশি প্রজাতির ফসল ও গাছপালা খেয়ে ধ্বংস করতে পারে। এরা উভলিঙ্গ প্রাণী। একটি শামুক বছরে প্রায় ১,২০০টি পর্যন্ত ডিম পাড়তে পারে, যার ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই এদের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়।
এ শামুক কৃষির জন্য চরম ক্ষতিকর। পাতা, ফল ও সবজির পাশাপাশি এরা ক্যালসিয়ামের প্রয়োজনে গাছের ছাল, বাড়ির পলেস্তারা ও কংক্রিট পর্যন্ত খেয়ে ফেলে। স্বাস্থ্য ঝুঁকি: এই শামুকের শরীর ও মলমূত্রে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পরজীবী ও ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে মারাত্মক রোগ (যেমন: মেনিনজাইটিস) হতে পারে। প্রকৃতিতে এদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন কারণ এদের খুব একটা প্রাকৃতিক শত্রু নেই। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকার এবং কৃষি বিভাগ এদের বিস্তার রোধ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে।
শামুকের ক্ষতিকর একটি প্রজাতি ছড়িয়ে পড়েছে বাকৃবি (বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) ক্যাম্পাসে। Giant African Land Snail নামে বড় আকারের ওই শামুকটি ধ্বংস করছে ফুলগাছ, খেয়ে ফেলছে গাছের পাতা ও কচি ডাল। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নোটিশ বোর্ডে টাঙানো কাগজও খেয়ে ফেলছে তারা। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে প্রজাতিটি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রাণিজগতের মলাস্কা পর্বের নরমদেহী ও প্যাঁচানো খোলসে আবৃত প্রাণি হচ্ছে snail বা শামুক। মরুভূমি, নদী ও স্রোতস্বিনী, বদ্ধ জলাশয় ও সমুদ্র উপকূলে তাদের দেখতে পাওয়া যায়। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ নাজমুল আহসান হলের বাগান পরিচর্যাকারীরা জানায়, প্রতিবছর শীতকে সামনে রেখে হলের সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য বিভিন্ন রকম ফুলের গাছ লাগায় তারা।
এ বছর বড় আকারের এ শামুকগুলো গাঁদা, জিনিয়া, সিলভিয়া, বাগান বিলাস, ক্যাকটাসসহ বিভিন্ন গাছের কচি পাতা খেয়ে ফেলছে। কোনো গাছই টিকানো যাচ্ছে না। এমনকি হলের নোটিশ বোর্ডে টানানো কাগজও খেয়ে ফেলছে। আর একবার কোনো গাছ আক্রমণের শিকার হলে সে গাছকে বাঁচানো যাচ্ছে না।সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) নিরীহ এ প্রাণিটি ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে। নতুন প্রজাতির এ শামুকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু ছড়িয়েই পড়েনি, হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ব্যবস্থা।
জানা যায়, প্রাকৃতিক ও দেশীয় মাছের প্রধান খাদ্য হচ্ছে শামুকের ডিম ও মাংস। বিশেষ করে কৈ, শিং, মাগুর, ট্যাংরা, টাকি, শোল মাছের পোনার একমাত্র খাদ্য হচ্ছে শামুকের নরম ডিম। আর এ খাবার না পেলে ওই পোনা মারা যায়। শামুকের খোলসের ভেতরের নরম অংশ চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হওয়ায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ঘের মালিকেরা শামুক কিনে নিয়ে যায়। ড়া, ম্যাচোফেলিয়া ও মাইক্রোফেলিয়া নামে দুই ধরনের কীট শামুক থেকে খাবার সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে এবং ধান গাছের ক্ষতিকর পোকা-মাকড় খেয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি খেতের ব্যাপক উপকার করে থাকে।
বড় আকারের ও ক্ষতিকর ওই শামুক সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের একোয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ সালাম মিডিয়াকে বলেন, এ প্রজাতিটির নাম আফ্রিকান জায়ান্ট ল্যান্ড স্নেইল (Giant African Land Snail)। ২০০২ সালে শ্রীমঙ্গলের ডানকেন চা বাগানে এ প্রজাতিটি বাংলাদেশে প্রথম দেখতে পাওয়া যায়। ফসল ও বাগানের ক্ষতি করে বলে সে সময় এদের ধরে ধরে মেরে ফেলা হতো।এরপর এদের তেমন আর দেখা যায়নি। কিন্তু বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ প্রজাতির শামুকটির উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এরা ফসলের জন্য খুব ক্ষতিকর। বাগান নষ্ট করে ফেলে। সন্ধ্যা হলেই ঝাঁকে ঝাঁকে বের হয়ে আসে। আর দিনের বেলা অত্যাধিক সূর্যালোক থেকে বাঁচতে লুকিয়ে থাকে। অতি বৃষ্টির সময় এরা দালানের দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে আশ্রয় নেয়। এর মাংস খুবই শক্ত বিধায় পশু-পাখিরাও খায় না।
আমাদের দেশীয় যে শামুক আছে সেগুলো উপকারী। তারা স্থল ভূমিতে উঠে আসে না, বরং পানিতেই থাকে। কিন্তু এ প্রজাতিটি গাছপালা, লতাপাতা, ফলমূল খেয়ে ধ্বংস করে। এমনকি দিনের বেলাতেও গাছের পাতা খেয়ে গাছ ধ্বংস করে। যা আমাদের দেশের কৃষির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
বিদেশ থেকে আসা বিদেশি ও বাংলাদেশি নাগরিকদের সঙ্গে এ প্রজাতির শামুক বাংলাদেশে এসে থাকতে উল্লেখ করে ড. সালাম বলেন, বিভিন্ন সময় বাইরের দেশ থেকে আমাদের দেশে গাছ-পালা আনা হয়। সেখানকার মাটিতে কিংবা গাছের পাতার মধ্যে লুকিয়ে থেকে প্রজাতিটি আমাদের দেশে আসতে পারে। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে আরও তথ্য পাওয়া সম্ভব। ড. সালাম বলেন, ক্ষতিকর শামুকের এ প্রজাতিটি নির্মূলের জন্য এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং যেভাবেই হোক এর প্রজনন ও বৃদ্ধি প্রক্রিয়া নষ্ট করতে হবে।
এর উপকারিতা বলতে তেমন কিছুই নেই। একে ধ্বংস করার জন্য অনতিবিলম্বে পদক্ষেপ হাতে নিতে হবে। অন্যথায় এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এতে গোটা দেশের কৃষি ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে বলে জানান ড. সালাম।