গতকাল বুধবার বিকেল ৩টায় যখন জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা শুরু হয়, তখন রাজধানীসহ পুরো দেশ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। রাজধানীর বাইরে দেশের প্রায় সব জেলা-উপজেলায় গায়েবানা জানাজায় অংশ নেয় মানুষ। মূল জানাজাস্থল মানিক মিয়া এভিনিউ পূর্ণ হয়ে সেই ভিড় ছড়িয়ে পড়েছিল উত্তরে জাহাঙ্গীর গেট, পশ্চিমে মিরপুর রোড (শেওড়াপাড়া) এবং পূর্বে ফার্মগেট পেরিয়ে কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর ও মগবাজার পর্যন্ত। মাইকের আওয়াজ যত দূর পৌঁছেছে, মানুষ রাস্তায় কাতারবন্দি হয়ে জানাজায় দাঁড়িয়েছেন। অনেকের চোখের কোণে ছিল পানি, কেউ বা হাত তুলে নীরবে দোয়া করেছেন।”
এর আগে শীত উপেক্ষা করে গত মঙ্গলবার রাত থেকেই মানুষ মানিক মিয়া এভিনিউ, দলীয় কার্যালয়, এভারকেয়ারসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছিলেন।”
খালেদা জিয়ার মরদেহ গতকাল সকাল ৯টা ১৭ মিনিটের দিকে লাল-সবুজের বাংলাদেশের পতাকায় মোড়ানো একটি গাড়িতে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে গুলশানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দলের পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা ফ্রিজিং গাড়িটির চারপাশে কয়েক স্তরে ঘিরে হেঁটে হেঁটে চলতে থাকেন। এ সময় রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান হাজারো মানুষ। খালেদা জিয়ার মরদেহ বহনকারী গাড়িটি গুলশান এভিনিউয়ে তারেক রহমানের ১৯৬ নম্বর বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। মায়ের কফিনের পাশে বসে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন তারেক রহমান। সেখানে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজন তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।”
সকাল ১১টা ৫ মিনিটে গুলশান এভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসভবন থেকে খালেদা জিয়ার মরদেহ নিয়ে বড় ছেলে তারেক রহমান জানাজাস্থল জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার উদ্দেশে রওনা হন। গাড়িবহরে লাল-সবুজ রঙের বাসটিও ছিল। তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা জারনাজ রহমান, ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রীসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও জানাজাস্থলে যান।”
শুধু দলীয় নেতাকর্মী নন, জানাজায় অংশ নিয়েছেন সাধারণ চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, রিকশাচালক থেকে শুরু করে দেশের সর্বস্তরের মানুষ। সংসদ ভবনের আশপাশের ফুটপাত এমনকি নিকটস্থ ভবনগুলোর ছাদও ছিল লোকে লোকারণ্য। জানাজার ঠিক আগমুহূর্তে খালেদা জিয়াকে নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের কান্নাজড়িত বক্তৃতার পর যখন তারেক রহমান তাঁর মায়ের জন্য দোয়া চাইলেন, ক্ষমা চাইলেন, পিনপতন নীরবতায় তখন পুরো এলাকা যেন দেশনেত্রীর বিরহ-বেদনায় ভারী হয়ে ওঠে।”
রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে গতকাল বিকেল ৩টা ৩ মিনিটে খালেদা জিয়ার জানাজা শুরু হয়। ৩টা বেজে ৫ মিনিটে জানাজা শেষ হয়। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক খালেদা জিয়ার জানাজা পড়ান।”
খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। আরো উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, আসিফ নজরুল ও আদিলুর রহমান খান, কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী প্রমুখ।”
খালেদা জিয়ার নিজ দল বিএনপি নেতাদের মধ্যে ছিলেন—মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীসহ বিএনপির সর্বস্তরের নেতারকর্মীরা।'”
এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর প্রমুখ জানাজায় উপস্থিত ছিলেন।”
বেগম খালেদা জিয়ার এই শেষ বিদায়ে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, সৌদি আরবসহ ঢাকার ৩২টি দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা জানাজায় অংশ নেন। যার মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য নির্ধারিত স্থানে দাঁড়িয়ে তাঁরা এ সময় প্রত্যক্ষ করেন বাংলাদেশের মানুষের এই আবেগঘন মুহূর্ত। পাকিস্তানের স্পিকার আয়াজ সাদিক জানাজায় অংশ নেন।”
বেগম জিয়ার জানাজায় নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। জানাজাস্থলের মূল অংশে নারীদের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকলেও আশপাশের নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে হাজারো নারী অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানিয়েছেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীকে। তাঁদের অনেকের হাতে ছিল কালো ব্যাজ, মুখে ছিল শোকের ছায়া।”
জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটের দিকে খালেদা জিয়ার স্বামী, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়”।
গত মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। সরকারের পক্ষ থেকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে সাত দিনের শোক কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।”
আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ফ্যাসিস্ট সরকারের অত্যাচার ও কারাগারে বিনা চিকিৎসায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি দীর্ঘদিন থেকে লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। পাশাপাশি কিডনি, ফুসফুস, হার্ট ও চোখের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাও ছিল তাঁর। হার্ট ও ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ার পর মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শে গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে পরিস্থিতির অবনতি হলে তাঁকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) স্থানান্তর করা হয়।”
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড তাঁর চিকিৎসা তদারকি করেন। ডিসেম্বর মাসের শুরুতে চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় পরে তা সম্ভব হয়নি। টানা ৩৮ দিন হাসপাতালে থেকে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে গত মঙ্গলবার ভোর ৬টায় জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।”
তারেক রহমানকে প্রধান উপদেষ্টার সান্ত্বনা : অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন। জানাজাস্থলে উপস্থিত হয়ে তিনি খালেদা জিয়ার শোকাহত জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সান্ত্বনা দেন।”
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দায় থেকে হাসিনা কখনোই মুক্তি পাবেন না : সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা নিতে না দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। এই মৃত্যুর দায় থেকে শেখ হাসিনা কখনোই মুক্তি পাবেন না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। গতকাল বুধবার রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার জানাজার আগে তাঁর জীবন ও কর্ম তুলে ধরে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।”
নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী হাসিনার ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মিথ্যা মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দুই বছরের বেশি সময় কারাগারে আবদ্ধ ছিলেন খালেদা জিয়া। চিকিৎসার অভাবে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন দেশনেত্রী। সমগ্র দেশবাসী সাক্ষী, হেঁটে তিনি কারাগারে প্রবেশ করেছিলেন, কিন্তু নির্জন কারাগার থেকে তিনি বের হলেন চরম অসুস্থতা নিয়ে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, ‘দেশ-বিদেশের চিকিৎসকদের মতে পরে গৃহবন্দি থাকা চার বছরে তাঁকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা না দেওয়ায় তাঁর অসুস্থতা ক্রমে বেড়েছে। ফলে এভাবে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো এই অপরাজেয় নেত্রীর। তাই এই মৃত্যুর দায় থেকে ফ্যাসিবাদী হাসিনা কখনো মুক্তি পাবেন না।””
তিনি আরো বলেন, ‘খালেদা জিয়া জনগণের কল্যাণে একের পর এক গ্রহণ করেছেন যুগান্তকারী সব কর্মসূচি। তাঁর পরিকল্পনায় উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনের পর বাংলাদেশ বিশ্বে পরিচিত পেয়েছিল ইমার্জিং টাইগার হিসেবে।’ বক্তব্যে খালেদা জিয়ার জন্ম, পারিবারিক পরিস্থিতি, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর সংকটময় পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে উঠে আসা, পরে জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়।””