রাজশাহীর তানোর উপজেলার শিবনদী বিলে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দলবেঁধে পলাই জাল দিয়ে মাছ শিকারে মেতে উঠেছেন সৌখিন ও পেশাদার মৎস্যজীবীরা। প্রতিদিনই বিলজুড়ে দেখা যাচ্ছে মাছ ধরার এক উৎসবমুখর পরিবেশ। আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর পারস্পরিক সহযোগিতার দৃশ্য যেন নতুন করে ফিরিয়ে আনছে গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে। সরেজমিনে দেখা যায়, একেকটি দলে পাঁচ থেকে দশজন করে মাছ শিকারি পলাই জাল হাতে নিয়ে শিবনদী বিলে নেমেছেন। কেউ জাল টানছেন, কেউ মাছ সংগ্রহ করছেন, আবার কেউ দলকে সহায়তা করছেন—সব মিলিয়ে পুরো বিলজুড়ে তৈরি হয়েছে প্রাণচঞ্চল দৃশ্য।
জালে ধরা পড়ছে বোয়াল, রুই, কাতলা, শিংসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। মাছ উঠলেই মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে আনন্দের হইচই। ছোট কিংবা বড়—যে কোনো মাছ ধরা পড়লেই উচ্ছ্বাসে কমতি নেই। অনেকের চোখেমুখের আনন্দে যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রাপ্তির অনুভূতি। মাছ শিকারে আসা মোহনপুর উপজেলার ঘাসিগ্রাম গ্রামের আব্দুল, জব্বার ও বাদল জানান, তারা প্রতিবছরই দলবেঁধে শিবনদী বিলে মাছ ধরতে আসেন। প্রত্যেকে ১০ থেকে ২০ কেজি ওজনের পলাই জাল ব্যবহার করেন। তারা বলেন, দলগতভাবে মাছ ধরার সময় যদি কেউ মাছ না পান, তাহলে অন্যরা নিজেদের ধরা মাছ ভাগ করে দিয়ে তাকে হাসিমুখে বাড়ি পাঠান। তাদের কাছে মাছ ধরা কেবল আহরণের বিষয় নয়, বরং এটি আনন্দ, বন্ধন আর সৌহার্দ্যের এক বিশেষ উপলক্ষ।
আশরাফুল বলেন,মাছ ধরা আমাদের পেশা না। এটা আমাদের শখ, বিনোদন আর মিলনমেলা। বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমরা সবাই একসঙ্গে মিলিত হয়ে এই আনন্দ উপভোগ করি। এই সময়টা আমাদের কাছে ঈদের আনন্দের মতোই।”
পানি নামলেই শুরু হয় প্রস্তুতি
অন্যদিকে তানোর উপজেলার ঢোরসা গ্রামের মজিদুল ইসলাম জানান, বন্যার পানি নামতে শুরু করলেই তারা দলবেঁধে বিলের বিভিন্ন খাড়ি ও প্রবেশমুখ ঘিরে রাখেন। এরপর পানি কমে এলে পলাই জাল ব্যবহার করে এবং কোথাও কোথাও স্যালো মেশিনের মাধ্যমে পানি শুকিয়ে মাছ ধরা হয়।
তিনি বলেন,
“পানি শুকিয়ে মাছ ধরলে তুলনামূলকভাবে বেশি মাছ পাওয়া যায়। তাই সবাই মিলে পরিকল্পনা করে কাজ করি।
এ বিষয়ে তানোর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাজু চৌধুরী বলেন, শিবনদী বিলে নানা প্রজাতির মাছের স্বাভাবিক বিচরণ রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে আশপাশের পুকুর, খাল ও জলাশয়ের চাষ করা মাছ বন্যার পানির সঙ্গে ভেসে এসে এই বিলে জমা হয়।
তিনি জানান,এই শিবনদী বিলকে কেন্দ্র করে তানোর উপজেলায় প্রায় এক হাজার মৎস্যজীবী সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এটি এ এলাকার মানুষের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও মৎস্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের দলবদ্ধ মাছ শিকার একদিকে যেমন গ্রামীণ ঐতিহ্য ও আনন্দের প্রতীক, অন্যদিকে অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত আহরণ দীর্ঘমেয়াদে মাছের প্রজনন এবং জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে খাড়ি ঘিরে রাখা, পানি শুকিয়ে মাছ ধরা এবং কোনো ধরনের বাছাই ছাড়া সব বয়সী মাছ আহরণ করলে ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে শিবনদী বিলসহ তানোর উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলোতে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, মৌসুমি বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন এবং মৎস্যজীবীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
স্থানীয়দের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শিবনদী বিলে মাছ শিকারের এই আনন্দঘন ঐতিহ্য যেমন টিকিয়ে রাখা সম্ভব, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা যাবে বিলের প্রাণবৈচিত্র্যও।