ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রদলের ছাত্রশিবির সংঘর্ষের নেপথ্যে চাঁদাবাজি !
সোমবার (২ মার্চ) মধ্যরাতে হঠাৎ ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। প্রায় দেড় ঘন্টাব্যাপী এ সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন অন্তত দশ জন শিক্ষার্থী । এর মধ্যে একজন ছাত্রদল ও একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী ছাড়া বাকি সবাই সাবেক ছাত্রলীগের মানে বর্তমান ছাত্র শিবিরের নেতাকর্ম।
এ ঘটনায় ইনস্টিটিউটের লতিফ ছাত্রাবাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সূত্র বলছে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এর আশেপাশের সড়ক ও প্রতিষ্ঠানটি খেলার মাঠে অবৈধ রিক্সা গ্যারেজ স্থাপন ও সেখান থেকে চাঁদাবাজি ঘিরে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত । এছাড়াও এতে নেতৃত্বে দিয়েছেন ৫ই আগস্ট এর পরে ছাত্রদলের যোগ দেওয়া ছাত্রলীগ কর্মীরা ( উল্লেখ্য যে বর্তমান ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্র শিবিরের সভাপতি নিজেও সাবেক ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন )।
এমনকি ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টদের নেতৃত্বে সংঘর্ষের কথা প্রকাশ্যে বলায় এক ছাত্রদল নেতাকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় সংসদ । এদিকে ক্যাম্পাস ঘিরে নতুন করে রিকশা গ্যারেজ বসা শুরু হয়েছে । তবে তদন্তের আগে চাঁদাবাজি ও অবৈধ রিকশা গ্যারেজ নিয়ে কথা বলতে নারাজ ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ । বলেছেন তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে ।
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এর শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আশেপাশের রিকশা গ্যারেজের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ক্যাম্পাসে হলের আশেপাশে বিভিন্ন সড়ক ও লাভ রোডে প্রতিষ্ঠানটি খেলার মাঠে অন্তত ছয় থেকে আটটি স্পটে অন্তত ৩০ টি অবৈধ রিকশা গ্যারেজ ছিল।
গত ২৭শে জানুয়ারি ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এর একদল শিক্ষার্থী এসব গ্যারেজ উচ্ছেদ করেন। মূলত জাতীয় নাগরিক পার্টি ( এনসিপি )ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্র শক্তি ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে উচ্ছেদ হয়। উচ্ছেদ করতে গেলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রিক্সা গ্যারেজ সিন্ডিকেট সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ে। সে সময় রিক্সা গ্যারেজ থেকে ছাত্রদল নেতা কর্মীদের চাঁদাবাজির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে । উচ্ছেদ করতে গেলে একাধিক রিকশাচালক জানান , পলিটেকনিক শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সাব্বির হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক হাফিজের অনুসারীরা চাঁদার বিনিময়ে তাদের রিকশা গ্যারেজ থাকতে দেন।
ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের সংঘর্ষের পর শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও রিক্সা গ্যারেজ সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চাইলে তারা জানান ,সে সময় অবৈধ রিক্সা গ্যারেজগুলোর কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে তিন হাজার টাকা করে আদায় করতেন ছাত্রদল নেতা কর্মীরা । প্রায় ৩০ টি রিক্সা গ্যারেজ থেকে সপ্তাহে চাঁদা উঠতো অন্তত ৯০ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা । ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীদের অভিযোগ রিক্সা গেরেজ উচ্ছেদ করা হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেখে নেওয়া হবে বলে হুমকি দেন ছাত্রদল নেতা কর্মীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পলিটেকনিক এর একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এটিভি কে জানান, নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠন হলে পলিটেকনিকের আশেপাশে রিক্সা গ্যারেজ গুলো পুনরায় স্থাপন করার উদ্যোগ নেয় বর্তমান ছাত্রদলের সভাপতি সাব্বির হোসেন ও হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে । এদিকে ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা গ্যারেজ মালিকদেরকে হুমকি দিয়ে আসেন গ্যারেজ না বসাতে। যার ফলে সোমবার রাতে সংঘর্ষে রূপ নেয় ।
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এর লতিফ হলের পাশের সড়ক ও খেলার মাঠে অবৈধ গ্যারেজ স্থাপনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। খেলার মাঠে রিক্সা গ্যারেজের পাশাপাশি অবৈধ পার্কিং ও ভাঙারী দোকানও বসেছে ।
একটি রিক্সা গ্যারেজের একজন মহাজন বলেছেন রিক্সা গ্যারেজ উচ্ছেদের পর গ্যারেজ মালিকদের পাশাপাশি রিক্সাওয়ালারাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তারা জানিয়েছেন তাদের আসলে সেভাবে কোন স্পেসিফিক জায়গা নাই গ্যারেজ দেওয়ার এবং কোথাও রিক্সা চার্জ দিতে গেলে দ্বিগুণ হারে ভাড়া দাবি করেন যার ফলে, তাদের মতে বর্তমান যেখানে তারা অবস্থান করছেন সেখানে তাদের সাশ্রয় মূল্যে রিক্সা চার্জ দিতে পারেন।
মহাজন আরো বলেন, তারা কখনো সরাসরি চাঁদা চাইনি সব সময় নিজেদের ছেলেদের পড়াশোনা করার জন্য চাইতো। এখন রাস্তায় অবৈধভাবে বসতে গেলে কাউকে না কাউকে কিছু দিতে হবে তারা যদি সেফটি দেয় তাহলে সমস্যা কোথায়?
এসব গ্যারেজ মালিক, কর্মচারী ও রিক্সা শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে চাঁদাবাজির প্রসঙ্গে ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম পাওয়া গেছে। তারা বলেছেন চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সাব্বির ও হাফিজের অনুসারীরা ।
সংঘর্ষের নেতৃত্বে সাবেক ছাত্রলীগ ও বহিষ্কৃতরা :
তাদের ভাষ্যমতে গত সোমবার রাত এগারোটার দিকে হল মসজিদ থেকে তারাবি নামাজ শেষে শাখা ছাত্র শিবিরের সম্পাদক মারুফ বিল্লাহ সহ সংগঠনটির কর্মী রাইসুল বারী ও সাইফুল হল ভবনে ফিরছিলেন । তারা ঢাকা পলিটেকনিক ল্যাবরেটরি স্কুল মোড়ে পৌঁছালে টং দোকানে বসে থাকা ছাত্রদলের নেতা ও শেষ বর্ষের ছাত্র মেহেদী সহ চার পাঁচ জন তাদের সঙ্গে কথা বলতে যান । এ সময় তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হয়।
শিক্ষার্থী মারফত জানতে পেরেছি, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রদলের কমিটি মাত্র দুই সদস্যের। এর সভাপতি সাব্বির আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক হাফিজ উদ্দিন।
পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রদলের বৃহত্তর একটি অংশ যারা প্রকৃত আন্দোলনের সংগ্রামে লিপ্ত ছিল দীর্ঘদিন হাসিনার সময়, তাদেরকে মাইনাস করে শুধুমাত্র দুই সদস্যের কমিটি দেওয়া হয়েছে ।
বর্তমান সভাপতি ও সেক্রেটারির তেমন সাংগঠনিক সক্ষমতা না থাকার কারণে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি। অথচ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ থেকে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এ নিয়ে ছাত্রদলের পলিটেকনিক শাখার সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বুলবুল আহমেদের সাথে কথা বলে জানতে পারি , পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রদলের সবচেয়ে ডেডিকেটেড ছাত্রদল নেতাকর্মীরা আতিকুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় ছাত্রদলের ঢাকা পলিটেকনিক শাখার হয়ে কাজ করে আসছেন , পলিটেকনিকের সাবেক এই ছাত্রনেতা আরোও জানান ,
২০১৩-১৪ সালের পর থেকে মূলত ৫ই জানুয়ারি ২০১৪ নির্বাচনের পর থেকে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এ ছাত্র শিবিরের সাংগঠনিক তৎপরতা শূন্য ছিল। তখন বর্তমান ছাত্রদলের সভাপতি এবং সেক্রেটারি নেতৃত্বে সাংগঠনিক তৎপরতা ছিল না । কিন্তু ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন বিএনপি বয়কট করে হরতাল ডাকে , তখন আমি সহ আতিকুর রহমান আতিক তেজগাঁওয়ে এর বিভিন্ন জোন এ হরতাল পালন করি দীর্ঘ এপথ চলাতে ৫ই আগস্ট আসে অথচ ছাত্রদল ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট শাখার সবচেয়ে যোগ্য এবং পরিশ্রমী ছাত্রনেতা আতিকুর রহমান আতিক প্রতিটি সভা সমাবেশ বিক্ষোভ মিছিলে ফুটেজ ও কারা নির্যাতনের ডকুমেন্ট প্রমাণসহ দিতে পারবেন , তারপরও পলিটেকনিক শাখার দুই দুইটা কমিটিতে তাকে একটিতেও রাখা হয়নি,,
অথচ তৎকালীন ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আন্ডারে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এই আতিকুর রহমান আতিক ভাই হামলা মামলার শিকার হয়েছেন। এত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এবং আমার দেশ পত্রিকাতে এ নিয়ে রিপোর্ট করার পরও ছাত্রদলের সিনিয়র কোন নেতৃবৃন্দের সহানুভূতিটুকু তিনি পাননি ও মূল্যায়িত হননি।
ছাত্রদল নেতা বুলবুল আরো বলেন, ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, পরিশ্রমী এবং মেধাবীদের এবং পলিটেকনিক থাকা সবচেয়ে বৃহত্তর অংশের ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে কর্মী শুন্যদের ও অসাংগঠনিকদের দিয়ে কমিটি দেওয়ার মাধ্যমে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রদলের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার হয়েছে। যার কারণে এই চাঁদাবাজির এবং ছাত্রলীগকে পূর্ণবাসন করে ছাত্রদলকে কলঙ্কিত করতেছে এবং নিজেদের ম্যানপাওয়ার বৃদ্ধি করতেছে । যা কখনোই ছাত্রদলের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না ।
ছাত্রদলের এ নেতা স্পষ্ট করে বলেছেন আমরা ডিসেন্ট পলিটিক্স করতে চাই ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক যারা যারা আছেন তাদের প্রতি আহ্বান জানাতে চাই সামনের দিনে যাতে ছাত্রদলের পরিশ্রমী মেধাবী ছাত্রদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেয়া হয় তাহলে ছাত্রদলের কোন কলঙ্ক থাকবে না , প্রকৃত ছাত্রদলের কর্মীরা পরিচয় পাবে।
ইতিমধ্যে সংঘর্ষের বিষয়ে ১০ সদস্যের একটি কমিটির গঠন করা হয়েছে কমিটিকে আগামী তিন কর্ম দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে ।