মুখবন্ধ : সড়কের কান্না
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে সড়ক যেন এক মরণফাঁদ। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে ভয়াবহ সব সড়ক দুর্ঘটনার খবর। আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নিয়ে রয়েছে হাজারো প্রশ্ন। “সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮” এবং পরবর্তীতে ২০২৪ সালের সংশোধনী সত্ত্বেও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যেন এক দুঃসাধ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইন আছে, প্রয়োগ কোথায়?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের প্রবণতা শুধু সাধারণ চালকদের মধ্যেই নয়, বরং শিক্ষিত সমাজ এবং খোদ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের মধ্যেও ভয়াবহ আকারে বিদ্যমান।
প্রধান অলঙ্ঘনীয় সমস্যাসমূহ
সিগন্যাল অমান্য করা : বিশেষ করে ঢাকা শহরের ইন্টারসেকশনগুলোতে ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলার হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় গাড়ি চললেও স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা প্রায় অকেজো।
উল্টো পথে গাড়ি চালানো : ভিআইপি সংস্কৃতি এবং সময়ের দোহাই দিয়ে উল্টো পথে গাড়ি চালানো এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
লাইসেন্সবিহীন চালক ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি: বিআরটিএ’র তথ্য ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের তুলনায় বৈধ লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা অনেক কম। বিশেষ করে মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে এই হার সবচেয়ে বেশি।
ফুটপাত দখল ও যত্রতত্র পার্কিং: মূল সড়কের একটা বড় অংশ দখল করে থাকে অবৈধ পার্কিং এবং ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা দোকানপাট, যা পথচারীদের মূল সড়কে নামতে বাধ্য করে।
আইনের শিথিলতা ও সাম্প্রতিক সংশোধন (২০২৪-২০২৬ প্রেক্ষাপট)
২০২৪ সালের মার্চ মাসে সড়ক পরিবহন আইনে বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে, যেখানে ১২টি ধারায় শাস্তি ও জরিমানা কমানো হয়েছে।
অপরাধের ধরন পূর্বের শাস্তি (উদাহরণ) সংশোধিত শাস্তি/অবস্থা (২০২৪-২৬)
ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যতীত গাড়ি চালানো ২৫,০০০ টাকা জরিমানা,
ট্রাফিক সংকেত লঙ্ঘন ১ মাসের জেল / ১০,০০০ টাকা জরিমানা, ২,০০০ টাকা জরিমানা জামিনযোগ্যতা কিছু এই শাস্তির পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া এবং অপরাধকে জামিনযোগ্য করা ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের আরও সাহসী করে তুলেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও চাঁদাবাজি
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে যে, সড়কে শৃঙ্খলার অভাবের পেছনে পরিবহন সিন্ডিকেট এবং চাঁদাবাজি বড় ভূমিকা পালন করে।
ফিটনেস জালিয়াতি : অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র পরীক্ষার মাধ্যমে বা দালালের মাধ্যমে গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা হয়।
সড়কে চাঁদাবাজি : বাস ও ট্রাক থেকে বিভিন্ন ধাপে রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাঁদা দেওয়ার প্রথা চালু থাকায়, চালকরা সেই টাকা তুলতে দ্রুত ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায়।
তথ্যচিত্র ও পরিসংখ্যান (২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত উপাত্ত)
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক ডিএমপি রিপোর্ট অনুযায়ী, ঢাকা শহরে একদিনেই গড়ে ১,৭০০ থেকে ২,২০০টি ট্রাফিক মামলা দায়ের করা হচ্ছে। এর মধ্যে সিংহভাগই মোটরসাইকেল এবং বাসের বিরুদ্ধে। তবুও প্রতিদিন সকাল হলেই চিত্রটি একই থেকে যায়।
সুপারিশ ও সমাধানের পথ
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কেবল আইন করলেই হবে না, প্রয়োজন এর কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
ডিজিটাল ট্রাফিকিং ব্যবস্থা: হিউম্যান ইন্টারভেনশন কমিয়ে ক্যামেরা ও সেন্সরের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় মামলা ও জরিমানা ব্যবস্থা চালু করা।
লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা : বিআরটিএ-কে দুর্নীতিমুক্ত করে চালকের দক্ষতা নিশ্চিত করে লাইসেন্স প্রদান।
গণপরিবহন সংস্কার: ব্যক্তি মালিকানাধীন বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করে ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু করা।
জনসচেতনতা : পথচারী ও চালক উভয়ের জন্যই ট্রাফিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
উপসংহার:
বাংলাদেশের ট্রাফিক আইন কাগজে-কলমে আধুনিক হলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি এখনও তিমিরে। আইনের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রভাবশালীদের দাপট এবং অব্যবস্থাপনা। যতক্ষণ পর্যন্ত আইনের চোখে সবাই সমান এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে না।