এস এম জামান। এটিভি সংবাদ /
মাগুরার মহম্মদপুরে রাজা সীতারাম রায়ের শাসনামল এবং তাঁর পতন বাংলার ইতিহাসের অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও নাটকীয় একটি অধ্যায়। তাঁর শাসনকাল এবং শেষ পরিণতি সম্পর্কে কিছুটা তুলে ধরা হলো;
মহম্মদপুরে রাজা সীতারাম রায়ের শাসনামল ছিল ১৬৯৭ থেকে ১৭১৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। মুর্শিদাবাদের নবাব সরকারের সাধারণ একজন আমলা বা তহশিলদার থেকে নিজের মেধা, বাহুবল ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় সীতারাম রায় ভূষণা অঞ্চলের সর্বেসর্বা এবং পরবর্তীতে স্বাধীন রাজা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৬৯৭-৯৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি বর্তমান দেশের মাগুরা জেলার মহম্মদপুরে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন।
তাঁর জিম্মাদারি বা রাজ্য পাবনা থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগর এবং নদীয়া থেকে বরিশাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সে সময় তাঁর বার্ষিক রাজস্ব আয় ছিল প্রায় ৭৮ লক্ষ টাকা।
শুরুতে তিনি এলাকার মগ, ফিরিঙ্গি ও দেশীয় দস্যু-তস্করদের কঠোর হাতে দমন করে প্রজাদের মধ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সেনাবাহিনীতে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের দক্ষ সৈনিক ও সেনাপতি নিয়োজিত ছিলেন।
মহম্মদপুরে তিনি একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ ও রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। তিন দিক থেকে নদী ও পরিখা দ্বারা সুরক্ষিত এই রাজধানীতে বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন মন্দির (যেমন বিখ্যাত দশভুজা মন্দির), কাছারি বাড়ি, দোলমঞ্চ এবং প্রজাদের পানি সংকট মেটাতে ও সেচ কাজের জন্য দুধসাগর, পদ্মপুকুরসহ বহু দিঘি ও জলাশয় খনন করেছিলেন।
বাংলার অন্যান্য স্বাধীনচেতা ভূঁইয়াদের মতো তিনিও মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শেষ দিকে মুঘলদের রাজস্ব প্রদান বন্ধ করে দিয়ে কার্যত একটি স্বাধীন সার্বভৌম হিন্দু রাজ্য গড়ে তোলেন।
রাজা সীতারামের শেষ পরিণতি ও পতন মুঘল সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং নবাবকে রাজস্ব দেওয়া বন্ধ করায় মুর্শিদাবাদের নওয়াব ফৌজদার ও বিশাল সেনাবহর পাঠিয়ে সীতারাম রায়কে দমনের সিদ্ধান্ত নেন।
১৭১৪ সালের দিকে বাংলার নবাব মুর্শিদ কুলী খানের পক্ষে নাটোর রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামজীবনের সেনাপতি দয়ারাম রায় এবং মুঘল যৌথ বাহিনী মহম্মদপুর দুর্গ আক্রমণ করে। সীতারাম রায় ও তাঁর সেনাপতিরা ‘কালে খান’ ও ‘ঝুমঝুম খান’ নামক বড় কামানসহ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে মুঘল বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। কিন্তু আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বিশাল মুঘল বাহিনীর সামনে শেষ পর্যন্ত টিকতে না পেরে তিনি পরাজিত ও বন্দি হন।
প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, পরাজিত করার পর সীতারাম রায়কে লোহার খাঁচায় বন্দি করে অত্যন্ত অপমানজনকভাবে মুর্শিদাবাদে নবাবের দরবারে পাঠানো হয়েছিল।
রাজা সীতারাম রায়ের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল তা নিয়ে অনেকের মাঝে মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, চরম অপমান ও নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে বাঁচতে তিনি তাঁর হাতের আংটিতে থাকা বিষ পান করে আত্মহত্যা করেন। আবার অন্য একটি মতে, নবাবের নির্দেশে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল অথবা বন্দি অবস্থায় অন্য কোনো উপায়ে তাঁর মৃত্যু ঘটে।
তাঁর এই পতনের মধ্য দিয়ে মাগুরার মহম্মদপুরের ভূষণা রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনের অবসান ঘটে এবং মুঘলদের প্রত্যক্ষ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।