মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেছেন, দেশে ডিজেল, পেট্রল, অকটেনসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ও দেশের জ্বালানি তেলের আমদানি মজুদ ও সরবরাহের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন জ্বালানিমন্ত্রী।
জ্বালানি তেল সরবরাহে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগ এড়াতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স ডিস্ট্রিবিউটরস এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, ‘আপাতত জ্বালানি তেলে কোনো সংকট নেই। এখন যে সংকটটা হয়েছে, তা প্যানিক বায়িংয়ের কারণে। এ ছাড়া শুক্র ও শনিবার ডিপো বন্ধ থাকায় তেল সরবরাহ করা হয়নি। এসব কারণে অনেক পাম্প বন্ধ রয়েছে। মানুষ হুজুগে। এখন তারা তেল কিনতে উন্মাদ হয়ে গেছে।’
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, ‘এখন জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। এ ছাড়া আমরা এখন জ্বালানি তেল কিনতে মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প উৎস নিয়ে কাজ করছি।’
আজ থেকে নতুন পদ্ধতিতে তেল বিক্রি
দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ভোক্তা পর্যায়ে এই তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এটি আজ রবিবার থেকে কার্যকর হবে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ দুই লিটার, প্রাইভেট কারে ১০ লিটার এবং এসইউভি, জিপ ও মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার অকটেন বা পেট্রল দেওয়া যাবে। ডিজেলচালিত পিকআপ ও লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও কনটেইনার ট্রাকে ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল দেওয়া যাবে।
বিপিসি জানিয়েছে, ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল নেওয়ার সময় ভোক্তাকে তেলের ধরন, পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করে ক্রয় রসিদ দিতে হবে। পরে তেল নেওয়ার সময় আগের ক্রয় রসিদের মূল কপি জমা দিতে হবে।
আসছে এলএনজি ও এলপিজিবাহী জাহাজ
ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে কিছুটা স্বস্তির খবর এসেছে। হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছে এলএনজি ও এলপিজিবাহী কয়েকটি বড় জাহাজ। এসব জাহাজে প্রায় আড়াই লাখ টন জ্বালানিপণ্য রয়েছে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, সংঘাতের কারণে বিশ্বে তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়লেও বাংলাদেশের জন্য আসা চারটি এলএনজি ও দুটি এলপিজি জাহাজ সময়মতো প্রণালি অতিক্রম করতে পেরেছে। এর মধ্যে ‘আল জোর’ ও ‘আল জাসাসিয়া’ জাহাজে এক লাখ ২৬ হাজার টন এলএনজি এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। ‘আল গালায়েল’ ও ‘লুসাইল’ নামে আরো দুটি এলএনজি জাহাজ পর্যায়ক্রমে আগামী সোমবার ও বুধবার বন্দরে পৌঁছাবে।
এ ছাড়া ‘জি ওয়াইএমএম’ জাহাজে ১৯ হাজার ৩১৬ টন এলপিজি এরই মধ্যে বন্দরে এসেছে এবং ‘সেভান’ জাহাজে ২২ হাজার ১৭২ টন এলপিজি নিয়ে রবিবার পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে এলএনজি রয়েছে প্রায় দুই লাখ ৪৭ হাজার টন এবং এলপিজি প্রায় ৩৫ হাজার টন।
ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত সংকট নেই
অপরিশোধিত তেলের কোনো সংকট নেই দেশের একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে এখনো অপরিশোধিত তেলের যে মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে আগামী ৩ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। দৈনিক চার হাজার মেট্রিক টন করে তেল পরিশোধন করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আসে। সেগুলো পরিশোধন করা হচ্ছে। প্রতিদিন চার হাজার মেট্রিক টন তেল পরিশোধন করা হচ্ছে। অকটেন ছাড়া ডিজেল, পেট্রল, ফার্নেস অয়েল, এলপিজি, জেট ফুয়েল ও বিটুমিন এ কারখানায় উৎপাদন করা যায়। অর্থাৎ যখন যে তেলের চাহিদা বেশি থাকে, তখন সে তেল বেশি উৎপাদন করা হয়।
ওই কর্মকর্তা আরো জানান, ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য আমদানির এক লাখ টন তেল ভর্তি জাহাজ অপেক্ষা করছে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে জাহাজটি আটকে পড়েছে। পরিস্থিতি ভালো হলে জাহাজটি দেশের উদ্দেশে রওনা দেবে। এ ছাড়া আরব আমিরাত থেকে আরো এক লাখ অপরিশোধিত তেল নিয়ে ২১ মার্চ দেশের উদ্দেশে আরো একটি জাহাজ রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে। আরব আমিরাত থেকে বাংলাদেশে জাহাজ পৌঁছাতে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ দিন সময় লাগে।
ঢাকার বাইরেও তেল নিয়ে আতঙ্ক
এদিকে যুদ্ধের গুজবকে কেন্দ্র করে ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় তেল নিয়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। রংপুরে জেলা প্রশাসন ১০টি ফিলিং স্টেশনে অভিযান চালিয়ে বিক্রি বন্ধ রাখার অভিযোগে চারটি প্রতিষ্ঠানকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।
খুলনায় গুজবের কারণে অনেক পাম্পে অস্বাভাবিক ভিড় দেখা গেছে এবং অনেকেই অতিরিক্ত তেল মজুদ করছে। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিদিন প্রায় ৩৯ লাখ লিটার জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
অন্যদিকে শেরপুরে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে মতবিনিময়সভা হয়েছে এবং সীমান্ত এলাকায় তেল পাচার ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে গোপালগঞ্জে বেশ কিছু পাম্পে তেল না থাকায় সাময়িক সংকট দেখা দিয়েছে।
ফিলিং স্টেশনের নিরাপত্তায় পুলিশের নজরদারি
রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের নিরাপত্তা নজরদারি করছে পুলিশ। জ্বালানি তেল নিয়ে সংকটের আশঙ্কায় গতকাল ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার গণমাধ্যমকে বলেন, একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে নজরদারি করছে। এসব স্টেশনে পুলিশের টহলদল তৎপর রয়েছে। কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির উদ্ভব হলে পুলিশ তা সামাল দেবে।