শামিমুর রহমান জিসান বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি //
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে পার্বত্য জেলা বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ভোটের চিত্র। ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সাচিং প্রু জেরীর নির্বাচনী প্রচারণাকে ঘিরে যে নজিরবিহীন জনসমাগম সৃষ্টি হয়েছে, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চোখে এক কথায় “ভোটের ভূমিকম্প”। পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে শুরু করে ব্যস্ত বাজার—সবখানেই ধানের শীষের পক্ষে মানুষের ঢল আলীকদমের নির্বাচনী সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আলীকদম বাজার, চৌমুহনী, কলার ঝিরি, নয়াপাড়া, লামাপাড়া, বিভিন্ন পাহাড়ি পাড়া-মহল্লা ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে গণসংযোগ, পথসভা ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো জনপদ। স্থানীয়দের ভাষায়, “আলীকদমে এমন জমায়েত বহু নির্বাচনে দেখা যায়নি।”
ইউনিয়নভিত্তিক প্রচারণায় জনসমর্থনের বিস্ফোরণ
নির্বাচনী প্রচারণা অনুষ্ঠিত হয় আলীকদম সদর ইউনিয়ন, কুরুকপাতা ইউনিয়ন ও চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে।
প্রতিটি ইউনিয়নেই ধানের শীষের পক্ষে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা থেকেও ভোটাররা নেমে আসেন প্রার্থীর সঙ্গে একনজর দেখা করতে ও কথা বলতে।
বিশেষ করে আলীকদম সদর ইউনিয়নে জনসমাগমের মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি, যা রাজনৈতিকভাবে এই ইউনিয়নকে “ডিসাইডিং ফ্যাক্টর” হিসেবে তুলে ধরছে।
ভোট কেন্দ্র ঘিরে পাল্টে যাওয়া দৃশ্যপট
প্রচারণায় যেসব ভোট কেন্দ্র এলাকায় ব্যাপক সাড়া মিলেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
আলীকদম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র
আলীকদম বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র
কুরুকপাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র
চৈক্ষ্যং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র
এই কেন্দ্রগুলোর ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হওয়ায় দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমেছে সাধারণ মানুষের মনে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের ঘাটতি ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলছে।
পাহাড়ি-বাঙালি ঐক্যের স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা
সাচিং প্রু জেরীর প্রচারণায় পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত উপস্থিতি আলীকদমের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। হেডম্যান, কারবারি, যুবসমাজ, নারী ভোটার ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে—ধানের শীষ এখন কেবল একটি দলীয় প্রতীক নয়, বরং এটি পাহাড়ে পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠছে।
একজন স্থানীয় প্রবীণ ভোটার বলেন,
“আমরা অনেক কিছু শুনেছি, কিন্তু বাস্তব কিছু দেখিনি। এবার আমরা নিজের চোখে পরিবর্তন দেখতে চাই।”
সাচিং প্রু জেরীর কণ্ঠে কঠোর রাজনৈতিক অঙ্গীকার
নির্বাচনী প্রচারণাকালে সাচিং প্রু জেরী বলেন,
“পাহাড়ের মানুষকে আর অবহেলার চোখে দেখা যাবে না। আলীকদমের মানুষ তাদের অধিকার নিয়ে বাঁচতে চায়। আমি নির্বাচিত হলে পাহাড়ের ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নে কোনো আপস করব না।”
তিনি আরও বলেন, পাহাড়ে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে।
ভোটের রাজনীতিতে ধানের শীষের মনস্তাত্ত্বিক এগিয়ে থাকা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আলীকদমে সাচিং প্রু জেরীর প্রচারণায় যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তা ভোটের মাঠে ধানের শীষ প্রতীকের জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা তৈরি করেছে। অতীতের নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আলীকদমে ভোটের রায় শেষ মুহূর্তে নাটকীয়ভাবে বদলাতে পারে। তবে এবারে শুরুতেই যে জনসমর্থন দেখা যাচ্ছে, তা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
আলীকদম থেকে পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে পড়া বার্তা
সব মিলিয়ে আলীকদমে সাচিং প্রু জেরীর নির্বাচনী প্রচারণা এখন আর শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়—এটি পাহাড়বাসীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ক্ষোভ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। ইউনিয়ন থেকে ভোট কেন্দ্র, বাজার থেকে পাহাড়ি পাড়া—সবখানেই যে বার্তা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, তা একটাই—
“এবার পাহাড় কথা বলবে, আলীকদমে ভোটের রায় বদলাবে।